কর্ম জীবনের গল্প: মধ্যরাতেই যখন আমার ভোর হয়

পৃথিবীতে যদি কোথাও শান্তি কিংবা সুখের পরশ থাকে সেটা হচ্ছে নিজের মাতৃভূমি। নিজের মা কে ছেড়ে দূরে থাকা যেরকম কষ্টের তেমনি নিজের দেশকে ছেড়ে প্রবাসে বাস্তবতার সাথে নিজেকে অঙ্গার করে পড়ে থাকাটা ও কম কষ্টের নয়। স্বাদের আমেরিকাতে এসে ছোট্ট জীবনে যে পরিমান অভিজ্ঞতা নিতে হয়েছে তা হয়তো মাতৃভূমিতে থাকলে অতটা পেতাম না।

এখানে ও বাংলাদেশের মত অফিস হয়, মানুষ খেটে খায়, মানুষের কষ্ট প্রতিদিন কত ধরণের রঙে যে বিষ্পোরিত হয় তা সামনা সামনি না দেখলে বুঝতামই না। আমেরিকা অনেক শক্তিশালী দেশ, কিন্তু তাতে আমার কি? আমার যা শক্তি আছে তাতো কেবল আমেরিকাকে দিয়েই যাচ্ছি। আমেরিকার শক্তি দিয়ে আমি কি করবো যদি আমার নিজের শক্তিই রাতের আঁধারে জীর্ণশীর্ণ হয়ে একটু ঘুমের জন্য আকুতি মিনতি করতে করতে বিলীন হয়ে যায়। আমেরিকায় রাত দিন বলে কোন কথা নেই।

এখানে চাকরি করে পেট চালাতে হলে অফিসের টাইম অনুযায়ী কাজ খুঁজে পাওয়াটা অনেক দুর্লভ, মানে আপনি যদি পড়ালেখা না করে সারাজীবন খাটুনি টাইপের চাকরি করতে চান তাহলে যেকোন সময়ই আপনাকে কাজে যাবার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে। আমেরিকার ১৫ বছরের জীবনে খাটুনি টাইপের কাজ অনেক করেছি, আজ কর্ম জীবনের গল্প থেকে একটা গল্প আপনাদের সাথে শেয়ার করবো।

আমি ২০০৮ সালে হোল ফুডস মার্কেটে, মাছের ডিপার্টমেন্টে কাজ করি। সাধারণত দোকান খুলতো প্রতিদিন সকাল ৮.০০ টায়, কিন্তু আমি মাছের ডিপার্টমেন্টে কাজ করি বিধায় আমার ডিসপ্লে করার জন্য কাজে যেতে হত ভোর ৪.০০টায়। তখন পার্ট টাইম কলেজ করতাম। তো আমাকে প্রতিদিন রাত ২.০০টায় ঘুম থেকে উঠতে হত।এই রাত ২.০০টায় আমার নিত্য দিন ভোর হত। ব্রাশ করে গোসল দিয়ে রেডি হতে হতে দেখি ম্যাচের অন্য কোন বন্ধু ট্যাক্সি চালিয়ে বাসায় ফিরছে তখন। কখনো কিছু না খেয়ে বা কখনো একটা বেলা বিস্কিট পানিতে চুবিয়ে রাত ২.৪৫এর দিকে ম্যানহাটান, সেকেন্ড এভিনিউতে কাজের উদ্দেশ্যে বেরিয়ে যেতাম।

কাজে পৌঁছেই ড্রেস পরিবর্তন করে প্রতিদিনের মত মাছ ডিসপ্লে করার জন্য বরফ দিয়ে সব ধরণের মাছগুলোকে সাজাতাম। সকাল আটটা বাজলে আরেকটা কলিক আসলেই তখন নাস্তা করার জন্য যেতাম। যাই হোক মোটামুটি আমার কাজ থাকতো সকাল ১২.০০টা পর্যন্ত। মাছের দোকানে কাজ করতাম, আর এদিকে সারা শরীরে মাছের গন্ধ হয়ে থাকতো। অনেক সময় ট্রেনে বসলে কেউ আমার আশে পাশে ও বসতো না। অবশ্য সেটা আমি বুঝতে পারতাম কেন ওরা সরে বসছে। মাঝে মধ্যে যখন সরাসরি বাসায় না গিয়ে ক্লাসে যেতাম, তখন একটু দূরে দূরে বসতাম, কারণ আমার শরীরে ওই সময় সেই রকমের একটা গন্ধ। একদিন বুদ্ধি করে বডি স্প্রে নিয়ে গিয়েছিলাম। ঐটা দেয়ার পর আরো জগণ্য হয়ে গিয়েছিল। তাই ঐটা বাদ দিয়ে যতটা পরিষ্কার হওয়া যায় সেটা চেষ্টা করতাম। যাই হোক ক্লাস শেষ করে বাসায় আসতে আসতে প্রায় সন্ধ্যে ঘনিয়ে যেত।

ওই সময় একদিন রান্না করে প্রায় ৬ দিন চালিয়ে নিতাম। আহ প্রবাস জীবন। আমার বাবা আমার সাথে থাকার কারণে অনেক সময় উনি রান্না করে রাখতেন, বাবার রান্না ব্যাচেলর বন্ধুরা খেয়ে খুবই মজা পেত। আব্বা ভালোই রান্না করতো। এইভাবেই তখন জীবনের অধ্যায় গুলো এগিয়ে চলছে। বাসায় রাতে এসে একটু স্টাডি করার সময় পেতাম। বেশির ভাগ হোমওয়ার্ক কখনো রাতে ট্রেনে কাজে যাবার সময় করা হত। যেদিন রান্না করা থাকতো সেদিন একটু বেশি সময় পেতাম। রাত ১০.০০টা বাজলেই আবার বিছানায় গিয়ে শরীরটা এলিয়ে দিতাম। এখানে স্বপ্নগুলো প্রতিনিয়ত ছুঁতে মন চাইতো। রাতের নিস্তব্দতায় কখনো কখনো হঠাৎ দেশে মায়ের কথা মনে পড়লেই বালিশ ভিজে যেত আনমনে। কম্বলের নিচে লুকিয়ে লুকিয়ে কত যে অশ্রু পড়ে বিছানা ভিজিয়েছি সেটা না হয় নাই বা বলি।

মাঝে মাঝে মন চাইতো দেশে গিয়ে গ্রামের মাটিতে নির্মল বাতাসে একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলি, কিন্তু দায়িত্ববোধ যে পুরো জীবনকে এভাবে পরিবর্তন করে দিতে পারে তা হয়তো প্রবাসে না আসলে টেরই পেতাম না। এভাবেই চার থেকে পাঁচ বছরের মত মধ্যরাতেই আমার ভোর হয়েছিল, অথচ যেসময় মানুষের সাথে সাথে গাছের পাতারা ও শব্ধবিহীন ঘুমিয়ে থাকতো। স্রষ্টার ইশারা বিনে তারা ও একবিন্দু নড়াচড়া করতো না। যাই হোক অনেকদিন গ্রামে ভোরের বাতাসে ফজর নামাজ পড়ে গ্রামের এপাড়া ওপাড়া ঘুরে বেড়ানো হয় নাই। ইনশাআল্লাহ যদি স্রষ্টা কখনো আবার সুযোগ করে দেয় তাহলে ভোরের পাখির কলতানে আমি আবার ভোর বিহানের স্বাদ নেয়ার চেষ্টায় থাকবো। হয়তো তখন আবার মধ্যরাতে ভোর না হয়ে সেই অজোপাড়া গায়ে আমি আবার হব সকাল বেলার পাখি।

Image Source: https://www.google.com/amp/s/observer.com/2013/10/lost-in-the-supermarket-bowery-whole-foods-robbed-of-60000/amp/

Leave a Reply