কিছু কিছু গল্প যখন নিজেকে আনমনে কাঁদায়

বাংলাদেশের প্রতিটি শীত, গ্রীষ্ম, শরৎ, হেমন্ত কিংবা বসন্ত কাটতো খুব হেসে খেলে। জীবনে যে এক ধরণের দায়িত্ববোধ আছে সেটাই জানতাম না। প্রতি মুহূর্তে জীবনকে উপভোগ করে চলছি ক্রিকেটের বল এবং ব্যাটে। কখনোবা বৃষ্টির পানিতে বন্ধুদের সাথে মিশে গিয়ে ফুটবল খেলায়। কখনো দূর্বাঘাসে বসে ষোলোগুটিতে, আবার কখনোবা চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতেই হাসি ঠাঠ্রায় ভরে উঠতো শহর অথবা গ্রামের গল্পগুলো।

আমেরিকায় আসলাম, তখনো দেশের দায়িত্বহীনতার মতই জীবন পার করছি। চারিদিকে আলোয় জ্বলমলে শহর। মনের ভিতরে রংধনুর মত মন কত কিছুই যে এঁকে যাচ্ছে তা বুঝানোর সাধ্য নেই। শুধু এতটুকু জেনেছি আমি আমেরিকায় এসেছি। তখনো ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ওয়েব সম্পর্কে কোন ধারণাই ছিল না। চট্টগ্রামে এক বড় ভাইয়ের কাছে পাঁচশো টাকা দিয়ে মাইক্রোসফট ওয়ার্ড শিখতাম। কিন্তু কি যে শিখেছি সেটাই জানি না। যদি ইন্টারনেট সম্পর্কে অনেক ধারণা থাকতো, তাহলে হয়তো অনেক বিকেল ঘরে বসেই কাটতো না।

দিন গড়িয়ে ধীরে ধীরে ব্যস্ত শহরের ব্যস্ততায় নিজেকে হারিয়ে ফেলছি। কিভাবে যে ডুবে গেলাম তা টেরই পেলাম না। বছর দুয়েক কিভাবে যে রাতে কাজ করে পার করেছি সেটাই ভাবতে পারি না। একটা সময় খুব বেশি ক্রিকেট খেলতাম। ক্রিকেট বলতেই ছিলাম অজ্ঞান। আমেরিকাতে আসার পর মোটামুটি তের বছরের মত ক্রিকেট খেলেছি। নিউ ইয়র্কে থাকতে বেশিরভাগ সময়ে খেলাগুলো ছুটির দিনে হত। শনি এবং রবিবার এই দুই দিন। অনেক সময় খেলার জন্য কাজের জায়গা থেকে মিথ্যে বলে ছুটি নিতাম। ক্রিকেট কেন জানি রক্তের মধ্যে এক ধরণের নেশার মত কাজ করতো। ব্যাট দিয়ে বল পিটাতে না পারলেই রক্ত গরম হয়ে যেত।

আমি খুব ভোরে কাজে গিয়ে বেলা ১টার মধ্যে বাসায় আসতে পারলেই খুব খুশি হতাম। বিকেলে সব কাজিন এবং এলাকার ছেলে পেলেরা মিলে টেপ টেনিস বল দিয়ে হিলক্রেস্ট স্কুলের মাঠে খেলা ছিল নিত্যদিনের সঙ্গী। একদিন কাজ পড়েছে বিকেলে। সবাই জিজ্ঞেস করছে, “মামুন ভাইয়া, আজকে বিকেলে খেলতে আসবেন না?”, বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, আমার হঠাৎ চোখে পানি চলে আসছে খেলতে পারবোনা দেখে। ওদেরকে বললাম, নারে আজ বোধহয় খেলতে পারবোনা। আজ কাজ আছে, সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে এখন আমার অনেক কিছু সামলাতে হয়। বাড়ি ভাড়া, খাওয়া দাওয়া, ক্রেডিট এবং ফোন বিলস, তারসাথে আবার কিছু পকেট খরচ লাগে প্রতিদিন বাহির হলে। এইসব কিছু মুহৃর্তেই চিন্তা করে আর যাওয়া হয় নি।

ট্রেনে বসে যেতে যেতে কত কথা চিন্তা করলাম। বাংলাদেশে কতটা স্বাধীন ছিলাম। বিকেলের সোনারোদে খেলতে যাওয়ার সময় আব্বা শুধু বলতো সন্ধ্যের আগেই যেন ফিরে আসি। সন্ধ্যের পর পড়তে বসতে হবে। আম্মা কখনো কোন কিছু নিয়ে চাপ দেয় নাই। আম্মা অনেক সহজ সরল মানুষ। অত কিছু বুঝতো না। বরং আমার খুশি দেখলেই উনি খুশি হয়ে যেতেন। ঠিক ওই দিন ট্রেনে বসার পর আমার সমস্ত স্মৃতি একে একে ভেসে উঠতে লাগলো। মনকে তখন প্রশ্ন করলাম এটাই বুঝি জীবনের দায়িত্ববোধ এবং কর্ত্যব্য। অথচ যখন বাবার ঘরে বসে আরামের দিন পার করছি, তখন একবারের জন্য ও চিন্তা করিনি আজ ঘরে ভাত কি দিয়ে খাওয়া হবে? মাছ বা গোশত কিভাবে বাসায় আসবে? কে বাজারে গিয়ে সব ধরণের গ্রোসারি করে নিয়ে আসবে। সময়ের সাথে সাথে আজ আমি নিজে ও দায়িত্বের খাতায় বন্ধি।

এখন নিজে নিজেই স্বপ্ন বুনি, কিন্তু তাতে ও মনে হয় কোথা ও যেন একটু কমতি আছে। দায়িত্বের পাশাপাশি অনেক স্বাধীন হয়েই পথ চলি, কিন্তু ঠিক ছেলেবেলার স্বাদ পাই না। জীবনের গল্পগুলোই বোধহয় এইরকমই। যখন সবকিছু ছিল তখন স্বপ্ন ছিল না, আর এখন স্বপ্ন দেখি কিন্তু অনেক কিছুই আজ চাইলে ও ফিরে পেতে পারি না। আমি এখনো স্বপ্ন গুলোকে নকশিকাঁথায় জড়িয়ে ঘরের এক কোণে জমা রেখে খোলা মাঠে মুক্ত বিহঙ্গের মত ঘুরে বেড়াতে চাই।

অপেক্ষায় চেয়ে থাকি আবার কবে পৌষ আসবে। অপেক্ষায় থাকি আবার কবে শ্রাবণের বারিধারায় নিজেকে ভিজিয়ে শুদ্ধ হবো। অপেক্ষায় থাকি কবে যে আবার শরতের কাশফুলের ভিড়ে নিজেকে হারাবো। অপেক্ষায় থাকি বসন্তের রঙে ফুলে ফুলে নিজেকে কবে যে রাঙাবো। অপেক্ষায় আছি শীতের শিশিরে নয়টার ফুল দেখে হয়তো কোন একদিন সময়ের অবলীলায় দুচোখ ভাসিয়ে দেবো। কবে যে দেখবো হিমেল বাতাসে লাল টকটকে কৃষ্ণচূড়ার দোদুল্যমান খেলা। শিমুল গাছে কোকিল বসে ধরেছে তার গান, বাতাসে বাতাসে ধান ক্ষেতে মিশে গিয়েছিলো যে ছেলেবেলা জানিনা সে পথের আর কখনো দেখা পাবো কিনা। এগুলো মনে করেই জীবন বহতা নদীর মত এগিয়ে যায়। নদী ও নাকি একদিন গিয়ে সাগরে মিশে, কিন্তু আমি যে আর কখনো ছেলেবেলায় মিশতে পারবোনা সেটা ভেবে ভেবেই হৃদয়ের মাঝে উথাল পাতাল তরঙ্গের সৃষ্টি হয়।

স্বপ্ন দেখি দখিনা বাতাসে চুল গুলো এলোমেলো হয়ে উড়বে সাঁকোর উপরে বসলে। পুকুরে পুকুরে সাঁতরিয়ে বেড়াবো মুক্ত পাখির মত। হয়তো ওই নির্জনে কোন এক রাখাল পাতার বাঁশি দিয়ে গান গাইবে এবং গোয়াল ঘরে গোয়াল গুলোর জন্য খাবার তৈরী করে তার কর্ম সম্পাদন করবে এবং সকাল সকাল খাঁটি দুধ খেয়ে আমি স্কুলের পথে রওয়ানা দিবো, বাড়ির কোনা ধরে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে হেঁটে যাবো বাজারে। কত হাজার গল্প শেয়ার হবে বন্ধুর সাথে বন্ধুর। এগুলো এখন কল্পনায় সবসময় বিচরণ করে। সময় আসলেই বড় নিষ্ঠুর। চাইলে যেন কোন কিছুই আর ফিরে পাবো না, শুধু স্মৃতিতে গেঁথে রাখা ছাড়া আর কোন পথ খোলা নেই।

এই ভিনদেশে হাজারো অপরূপ সৌন্ধর্য্যের মাঝে নিজেকে বিলিয়ে দিলেও আমি স্বাধীন ভাবে শৈশবের মত কিছুই করতে পারি না। একটি কাজ করতে হলে এখন আমাকে কয়েকবার চিন্তা ভাবনা করতে হয়। অথচ স্বাধীন বাংলার জীবনে ছিল না কোন বৈরিতা। শিকড় এমন এক জিনিস যদি সেটা কোন জঙ্গলে ও হত তাহলে ও এক বিন্দু পরিমান ভালোবাসার কমতি থাকতো না। তাই আজ এই অবেলায় এসে অনেক চাওয়া পাওয়াকেই বিসর্জন দিতে হয়। ক্রিকেটকে ও বিসর্জন দিতে হল ধীরে ধীরে। দায়িত্বের জন্য এইভাবে যুগে যুগে অনেক সন্তানরাই নিজেদের চাওয়া পাওয়া বিসর্জন দিয়ে বাবা মায়েদের কষ্টকে একদিন নিজের করে নিতে শিখে, ঠিক ততদিনে সেই সন্তান ও আরেকজন নিষ্পাপ শিশুর বাবা হয়ে হাল ধরতে শিখে। এখন সব বাবাদের চিত্রই আমি স্পষ্ট নিজের ছায়ায় দেখতে পাই, এবং দেখতে পাই বলে অনেক রাতে আমার ও বালিশ ভিজে যায়। তাই সব সময় রাব্বুল আল আমিনের কাছে ফরিয়াদ করে বলি, আমাকে শেষ খেদমতটুকু করার যেন তৌফিক দেয়া হয় যেভাবে আমার বাবা মা আমাকে শৈশবে লালন পালন করেছে, ঠিক সেইভাবে যেন তাদের প্রতি দায়িত্ব পালন করতে পারি। মহান সৃষ্টিকর্তা সকল সন্তানদের সেই তৌফিক দান করুক।

 

Leave a Reply