চেসাপিক বিচ

পৃথিবীর চারপাশে ভয়ঙ্কর এক ভাইরাস ঘুরে বেড়াচ্ছে। প্রতিনিয়ত মানুষ এই পৃথিবী ছেড়ে অন্য পৃথিবীতে ধাবিত হচ্ছে। প্রায় তিন মাসের ও বেশি আমরা ঘরবন্দি। জীবনটা কেমন যেন অস্বাভাবিক অস্বাভাবিক লাগছে। ছুটি নিয়ে ঘরে থাকাটাই যেখানে অনেক আনন্দের সেখানে ঘরে থাকতে থাকতে কেমন যেন জীবনটা একঘেয়ে হয়ে গেছে। আমার আদরের মেয়েটা ও যেন কানে কানে ফিসফিস করে বললো, আব্বু চলোনা কোথাও থেকে স্নিগ্ধ বাতাসের একটু পরশ নিয়ে আসি। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সহধর্মিনী বললো প্রকৃতিতে দুচোখের ডানা মেলে তোমার হাতে হাত রেখে সমুদ্রের গর্জন শুনতে ভীষণ ইচ্ছে করছে, তুমি কি আমাদেরকে একটু বেড়াতে নিয়ে যাবে?
আচ্ছা এত মায়া এবং ভালোবাসা দিয়ে কেউ যদি কিছু বলে সেখানে করোনা নামক শত্রু ও যেন হার মানতে বাধ্য হয়। এই করোনাকে তো বিগত তিন মাস সমীহ করে চললাম। ভার্জিনিয়াকে যেহেতু দ্বিতীয় ধাপে খুলে দেয়া হয়েছে সেহেতু ভামিনী এবং আদরের কন্যার চাওয়াগুলোকে মুহূর্তেই বাস্তবতায় রূপ দেয়ার চেষ্টা করলাম। সাথে সাথেই প্ল্যানিং করে ফেললাম কোথায় যাওয়া যায়। হুম এইবারের যাত্রা চেসাপেক বিচ।
তখন লোকাল সময় ছিল প্রায়  বিকাল ৪.৩০টা। আমার বাসা থেকে প্রায় ৬৬ মাইল দূরে এই বিচ। পরিবার সহ যাত্রা শুরু করলাম। ভ্রমণের সবচেয়ে ইন্টারেষ্টিং সময়টা হচ্ছে গাড়ির ভিতরে বসে থাকতে থাকতে যে গল্প গুলো করা হয় সেগুলো। মৃদু করে গাড়ির ভিতরে গান বাজিয়ে হাজারো কথোপকথনে ভ্রমণের গল্প জমে উঠছে সেইরাম। আগামী উইকেন্ডে কোথায় কোথায় যাবো বা কোথায় যাওয়া যায়?
যাই হোক প্রায় ঘন্টাখানেকের ও বেশি সময় নিয়ে আমরা পৌঁছে গেলাম চেসাপেক নর্থ বিচ। উইকিপিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী এই বিচটা হচ্ছে একটা শহর যেটা ম্যারিল্যান্ডের কালভার্ট কাউন্টিতে অবস্থিত। এটার সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হচ্ছে চেসাপেক বিচ রেলওয়ে স্টেশন, রেল ট্রেইল, ওয়াটার পার্ক, মেরিনাস, পিয়ার্স, এবং বোট ফিশিং। এই শহরে ২০১৮ সেনসাস এর মতে জনসংখ্যা হচ্ছে প্রায় ৫,৯৯০।
তো আমরা গাড়ি থেকে নেমেই যখন সমুদ্রের দিকে হেঁটে যাচ্ছি তখন দেখতে পেলাম আশে পাশে কিছু আইসক্রিম এর দোকান। ছোট্ট লোকালয় বেশ ভালোই লাগছে। করোনা ভাইরাস এর কারণে বিচে নামা বন্ধ ছিল। মৃদু বাতাসে শরীরে এক ধরণের মুক্ত এবং ফ্রেশ বাতাস অনুভব করলাম। সাগরের পাশে ট্রেইল ধরে হেঁটে যাচ্ছি। আমার মেয়েটা খুব উপভোগ করছিলো সাগরের পানির গর্জন। একটা ওয়াকিং ট্রেইল ঠিক অনেকটা সাগরের পানি ধরে অনেক দূর চলে গেছে। হাঁটতে হাঁটতে পিছনে তাকাতেই দেখি এক অপূর্ব দৃশ্য। ছোট ছোট টাউনহোম গুলো সাগরের পাশেই। সাগর থেকে দেখতেই অপূর্ব লাগছে।
ওখানে যেটা লক্ষ্য অনেক মানুষ বড়শি ফেলে মাছ ধরছে। আবহাওয়া ছিল মারাত্মক ভালো, ৮০ ডিগ্রী ফারেনহাইট। সূর্যের প্রখর রোদ্রে আমার মেয়ে দৌঁড়ে দৌঁড়ে পুরা ওয়াকিং ট্রেইল ভ্রমন উপভোগ করলো। কিছুক্ষন চারপাশ ঘুরে আমরা আইসক্রিম নিলাম। গাছের ছায়ায় সাগরের পাশে দাঁড়িয়ে সহধর্মিনী এবং কলিজার টুকরো ফাতিহা মনি সহ কিছু ছবি তুলে নিলাম স্মৃতিতে জমা করার জন্য। আমাদের খুব ভালো লেগেছে। আমার বিশেষ করে ওল্ড টাউন জাতীয় শহর গুলো দেখলেই খুব বেশি ভালো লাগে কারণ আমি যখন এই শহর গুলো দেখি তখন আমি আমার ফেলে আসা শৈশবের হাটবাজারের দৃশ্য গুলো অনুভব করি।
একবুক ভালোবাসা মেখে পরিবারকে নিয়ে বেড়াতে পেরে জীবন টা একটু একটু স্বাভাবিক হচ্ছিল। কি আর করা প্রকৃতির তো আর ঘরে ফিরে যেতে হবে না, তাই সে মানুষকে তার সৌন্ধর্য্য বিলিয়ে দেয়ার জন্য রাত দিন একই স্থানে পড়ে থাকে, কিন্তু আমাদের কি হবে? কি আর হবে? অবশেষে সাগরের ঠান্ডা  পানির ভালোবাসা নিয়ে পথ চলতে চলতে গাড়িতে ফিরে আসলাম। হুম বাড়ি ফিরে যেতে হবে। আলহামদুলিল্লাহ প্রকৃতির ছোঁয়া নিয়ে পরিবারের ভালোবাসায় আমরা ফিরে আসলাম আপন নীড়ে। এই ছিল চেসাপিক বিচের অভিজ্ঞতা।  সবাই ভালো থাকবেন এই মহামারীর ক্রান্তিলগ্নে। সবার সুস্বাস্থ্য কামনা করছি।

Leave a Reply