ছোট্ট কাজের মেয়ে “শারমিনের” গল্প

আমাদের সমাজে অনেক কিছু আছে যেগুলো নিয়মতান্ত্রিক না। আবার অনেক সময় দারিদ্রের সাথে লড়াই করতে করতে বাবা মায়েরা ও ক্ষুধার যন্ত্রনায় এইসব কম বয়সী ছেলে কিংবা মেয়েদেরকে মানুষের বাসা বাড়িতে কাজে পাঠিয়ে দেন। নিয়ম অনুযায়ী এইসব ছেলে মেয়েদের হয়তোবা কখনোই কারো বাসা বাড়িতে কাজ করা উচিত না। ওরা থাকার কথা অন্যান্য বাবা মায়েদের সন্তানদের মত অনেক যত্নে এবং পরম মমতায় তাদের বাবা মায়ের কাছে।
আমি জানি ইতিমধ্যে আপনাদের মনের মাঝে ও বিরূপ একটি প্রতিক্রিয়া হয়তো কাজ করছে। স্বাভাবিক কাজ করারই কথা। যে মেয়েটার কথা বলছি সে দেশে আমাদের বাড়িতে আমাদের ঘরেই কাজ করত। খুব বেশিদিন ওকে রাখতে দিই নি, কারণ আমি যখন দেশে গিয়ে ওকে দেখি তখন খুব মায়া হত ওর জন্য। আব্বা আম্মাকে বললাম ওতটুকুন একটা মেয়ে কি কাজ করবে? আব্বা আম্মা বললো আমরা তো ওকে রাখতে চাইনি। জানিস ওর বাবা অনেক অনুরোধ করেছে ওকে এখানে রাখতে। জিজ্ঞেস করলাম কি জন্য অনুরোধ করেছে? আম্মা বললো, ওর বাবা বলেছে ওদের ঘরে ঠিকমত এক বেলা খাবার দিতে পারে না, আপনাদের কাছে থাকলে অন্তত আমার মেয়েটা তিন বেলা খেয়ে বাঁচতে পারবে।এই উপকারটুকু যেন করেন। তখন সবকিছু ভেবেই হয়তো শারমিনকে আব্বা আম্মা নিজেদের কাছে রেখে দিলেন।
আসলেই দারিদ্রতার কাছে মানুষ কত যে অসহায় তা এই শারমিনকে নিজ চোখে না দেখলে হয়তো বুঝতাম না। প্রায় বছর দশেক আগে যখন দেশে গিয়েছিলাম তখন শারমিনকে আমি প্রত্যক্ষ ভাবে সামনে থেকে দেখেছি। কাজের মধ্যে ওর কাজ ছিল এ ঘর ও ঘর থেকে আম্মাকে মসলা পাতি, চাউল, তেল কিংবা অন্যান্য জিনিস এনে দেওয়া, মাঝে মাঝে ঘর ঝাড়ু দেওয়া। আমাকে মামা বলে ডাকতো। এত সুন্দর করে মামা ডাকতো তা শুনে আরো মনটা গলে যেত। অনেক কিছু উচ্চারণ করতে পারতো না। যেমন আমি বাজার থেকে আসলে আম্মা ওকে পাঠাতো বলার জন্য এক গ্লাস দুধ খাবো কিনা। মজার বিষয় হচ্ছে ও দৌঁড়ে এসে বলতো “মামা মামা আপনি তুত খাইবেন নি?”, আমি হাসতে হাসতে শেষ ওর কথা শুনে। জিজ্ঞেস করলাম, শারমিন তুত কিরে? ঐযে নানু বলছে তুত খাবেন নাকি? আমি বললাম তোর নানু কোথায়? ও বললো রান্না ঘরে। চল তুই সহ রান্না ঘরে তোর নানুকে গিয়ে জিজ্ঞেস করি “তুত” কি? আম্মাকে জিজ্ঞেস করলাম, আম্মা শারমিন কিসের তুতের কথা বলছে? আম্মা হাসার জন্য কথা বলতে পারছে না। আম্মা কয় তুত না দুধ। হিতি দুধ উচ্চারণ করতে পারে না।
বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, মুহূর্তেই আমার চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা পানি জমলো কারণ যে মেয়ে কিনা বাবা মায়ের আদরে আদরে মানুষ হবার কথা, সে মেয়ে পেটের ক্ষুধা নিভাতে ঘরে এসে কাজ নিয়েছে। অথচ সে এখনো ঠিক মত অনেক কিছুই উচ্চারণ করতে পারে না। মুহূর্তেই ওর জায়গায় নিজেদের ভাতিজি কিংবা ভাতিজাকে বসিয়ে চিন্তা করলাম, ওদেরকে ওদের মা বাবা ঠিক মত এক গ্লাস পানি নিয়ে খাবানোর জন্য ও বলে না আর ওদের বয়সী একটা মেয়েকে এক গ্লাস পানি আনতে বলাটা ও এক ধরণের অপরাধ নয় কি? শারমিন খুশি মনেই আমার জন্য এটা ওটা নিয়ে আসতে চাইতো, কিন্তু আমি নিষেধ করে দিয়েছি যাতে শারমিন কোন কিছুই আমার জন্য না আনে, আমি নিজেই যা নেয়ার নিয়ে নিবো।
শারমিনের সাথে আমি তখন আমার কোন তফাৎ দেখি না। আমি ও একটা সময় বাবা মায়ের আদরের সন্তান হয়ে তাদের কাছেই ছিলাম, তারপর বিদেশে পাড়ি দেবার পর যখন ঘরের কাজের ছেলে মেয়ের মত সব কাজ নিজেকেই করতে হয় দেখি তখন অতটুকু বয়সের একটা মেয়ের কষ্ট বুকের মাঝে অনুভব করতে পারি। এই বিদেশে দিনশেষে অনেক সময় আমাদের ও বালিশ চোখের জলে কম ভিজে নি, শারমিনদের মত মেয়েদের এইক্ষেত্রে প্রতিনিয়তই হয়তো ভিজতো কিন্তু ওরা দরিদ্র বলে সেগুলো কারো চোখে পড়তো না। সত্যি বলতে শারমিনের প্রত্যেকটি জিনিস আমার চোখের সামনে ভাসছে আর আমি তখন নিজেকে ওর মাঝেই আবিষ্কার করছি।
শারমিনরা ও একদিন নীড়ে ফিরে যায়, মায়ের কোলে একটু আদর এবং মমতা পাওয়ার জন্য, যেমনটি আমরা বিদেশ থেকে দেশে গেলেই কয়েকদিনের জন্য সেই মমতা পাই মা বাবার নিকট গেলেই। ঠিক কোন অংশেই শারমিনের সাথে আমাদের জীবন ব্যতিক্রম নয়। বরং শারমিনরা একধাপ এগিয়ে, ও যে বয়সে জীবিকার বা পেট বাঁচানোর হাল ধরেছে, সে বয়সে আমাদের কাউকেই কিছু করতে হয় নি। আমরা সেই দিক দিয়ে ভাগ্যবান হলে ও শারমিনরা দারিদ্রতার কারণে ওই দিক থেকে পুরোটাই অভাগী। জীবন মানুষকে কত কিছু যে শিখায়।
আব্বা আম্মাকে এক রাতে বললাম, শারমিনকে ঘরে কাজের জন্য রাখা যাবে না। ওর যে বয়স ওটাকে শিশুশ্রম বলে, আর শিশুশ্রম অনেক দেশেই নিষিদ্ধ। জেনেশুনে শারমিনকে রাখা বিশাল অন্যায়। আম্মা বললো আমরা তো চাই নি, ওর বাবাই জোর করে রেখে গেছে। জানি তারপর ও ওর বাবাকে বুঝিয়ে বলে শারমিনকে ওর বাড়িতে পাঠিয়ে দিতে হবে। ওর এখন বাচ্চাদের সাথে খেলার বয়স, স্কুল এবং মক্তবে যাবার বয়স, বাবা মায়ের আদর পাওয়ার বয়স। ব্যস আব্বা আম্মা কথাটা শুনে সম্পূর্ণভাবে রাজি হয়ে ওকে ওর বাবার কাছে পাঠানোর নির্দেশ দেয়। পক্ষান্তরে ওর বাবাকে বলছে আমাদের বাড়িতে বদলা হিসেবে খেটে খাবার জন্য। অবশেষে তাই হল। আমার অন্তরটা কেন জানি খুব বেশি শান্তি অনুভব করলাম।
আমরা জানি বাংলাদেশে এই রকম অহরহ ছেলে মেয়ে বিভিন্ন বাসা বাড়িতে কাজ করে বেড়ায়। এটা অন্যায়, যারা বিদেশে থাকেন তারা অনেকেই এই ব্যাথা গুলো অনুভব করেন। কিন্তু যারা দেশে থাকেন তারা অনেক কিছুই দেখে ও দেখতে পান না। তাই যারা দেশে আছেন বা যারা বিদেশে আছেন এবং যাদের ঘরে ছোট্ট ছোট্ট বাচ্চারা কাজে কর্মে আছে তাদের প্রতি আপনারা একটু সদয় হবেন। শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে নিজেদের অবস্থান গ্রহণ করুন। গরিব ঘরে জন্মানোই ওদের অপরাধ নয়।  ওদের মত সৃষ্টিকর্তা চাইলে আপনাকে বা আমাকে ও পাঠাতে পারতো। ওদের ক্ষুধা এবং আমাদের ক্ষুধার আলাদা কোন রং নেই। দুইটারই একই রং, ক্ষুধা লাগলেই খাবার খেলেই শান্তি। তাই মানুষ হিসেবে আমরা ক্ষুধার জন্য যেন মনুষ্যত্ব না হারিয়ে ফেলি সেদিকে খেয়াল রাখবেন।
শারমিন তোর কথা গুলো এখনো মাঝে মাঝে আমার অন্তরে ভাসে। জানিনা কোথায় আছিস বা কেমন আছিস। তুই যেখানেই থাকিস ভালো থাকবি সেটাই তোর মামার প্রার্থনা। তোরা যে বয়সে বাবা মায়ের ঘরে হাল ধরেছিস, আমরা তোদের কাছেই সেই তুলনায় কিছুই না। তোর মলিন মুখের সেই হাসি, মাহাদীকে কোলে নিয়ে হেঁটে বেড়ানো, তোর নানুর সাথে ছোট্ট ছোট্ট গল্প, এবং আপারা বাড়িতে বেড়াতে আসলেই তোর আনন্দে উদ্বেলিত হওয়াটা যেন এখনো প্রাণে দোলা দেয়। বাবা, মা, ভাই বোন নিয়ে ভালো থাকিস। আল্লাহ তোর মঙ্গল করুন।

Leave a Reply