প্রবাসের পথে ছুটে যাওয়া

সময়টা তখন ছিল ছাত্র জীবনের। বিদেশ বলতেই বুঝতাম ময়লা এবং দুর্গন্ধবিহীন শহর। আমি বিদেশে আসবো সেই কথা কখনো চিন্তাই করতে পারিনি। আমার সমস্ত অঙ্গ জুড়ে মিশে থাকতো গ্রামের মেঠোপথ, পুকুর, জামগাছ, ক্রিকেট, মাছ ধরা, মায়ের আঁচলে নিজেকে পেঁচিয়ে জড়িয়ে থাকা, সাত সকালে মায়ের হাতের চাউল ভাজা এবং শীতের পিঠা খাওয়া। এগুলোর বাইরে যে কত সংগ্রাম, কত যুদ্ধ আছে সেটাই জানতাম না।

একদিন বাংলাদেশ সময় গভীর রাত ৩.০০ টায় আমেরিকা থেকে আমার কাকার কল আসলো আব্বার কাছে। আব্বা ভাইয়ের ফোন দেখেই ঘুম থেকে উঠে বসলেন। জিজ্ঞেস করলেন তুই ঠিক আছিস তো? এত রাতে ফোন দেখে ঘাবড়ে গেছি। চাচা বললো মামুনের পুরো নাম কি দেয়া আছে সার্টিফিকেটে। পুরো নামটা একটু লাগবে। আমি ও ঘুম ভেঙে আম্মার সাথে বসে আছি। আব্বা জিজ্ঞেস করলো ওর নাম দিয়ে কি করবি? চাচা বললো মামুন ২১ বছরের নিচে হওয়ায় ও আপনার সাথে আমেরিকা আসতে পারবে।
এই কথা শুনে প্রথমে যে খুশি লাগলো, আর আমি খুশির চোটে ক্যালেন্ডারে দেখা ম্যানহাটানের ছবি দেখি আর ভাবতে লাগলাম আমি বুঝি এই সিটি দেখতে পাবো। কিছুক্ষন পর মনটা আবার ভীষণ খারাপ ও হয়ে গেল। আম্মা অসুস্থ থাকায় উনার জন্য তখন আবেদন করা হয় নি। আম্মাকে ছাড়া আমি কোথাও পনেরো দিনের বেশি থাকতে পারি নি, আর উনাকে দেশে রেখে যাবো এইটা মনে হওয়াতেই মনটা চূর্ন বিচূর্ণ হয়ে গেল।
কিছুদিন পর ইন্টারভিউর কাগজ পত্র আসলো। ইন্টারভিউ হল, ব্যাস একটু আরাম করে ছয়টা মাস থেকে তারপর না হয় আমেরিকা যাবো। ওমা হঠাৎ করে এম্বেসী থেকে আমার নামে একটা চিঠি আসলো। এইদিকে আব্বা ভয়ে চিঠি খুলে না, বলে আমি গিয়ে ওখানে কি করবো, দরকার তো তোর ঐদেশে যাবার। চিঠি না খুলেই যতসব কথা বার্তা। চিঠি খুলে দেখে ওরা আমাকে তিন মাসের মধ্যে আমেরিকায় আসতে বলেছে, কারণ তিন মাস পর আমার বয়স একুশ হয়ে যাবে সেই জন্য।
এইটা দেখে কিছুটা স্বস্তি এসেছে বলা যায়। এরপর রোজার ঈদের তিন দিন আগেই আমি এবং আব্বা আমেরিকার উদ্দেশ্যে যাত্রা করলাম। জেএফকে এয়ারপোর্ট থেকে বাহির হতে না হতেই আমার ঠোঁট থেকে রক্ত পড়া শুরু করলো, ঠান্ডায় ঠোঁট ফেটে কি যে অবস্থা, এই দিকে কাকার গালাগালি, কতবার বলছি ভালো করে জ্যাকেট পর। আমি তো জানতামই না এইখানে এই ধরণের ঠান্ডা পড়ে। টানা তিন দিন ঘর থেকেই বাহির হই নি ভয়ে।
কি পেয়েছি এই প্রবাসে?
প্রবাসে এসে অনেক স্ট্রাগল করতে হয়েছে। কাজের পাশাপাশি পড়ালেখা করে একটা ইলেকট্রিকাল ইঞ্জিনিয়ারিং ডিগ্রী নিয়েছি। বিভিন্ন ধরণের রিটেল স্টোরগুলো পড়ালেখা করতে অনেক সহযোগিতা করেছে। প্রচুর বন্ধু বান্ধব পেয়েছি। এই শহরে আগুন নিয়ে খেলতে শিখেছি। একা একা অনেক অসাধ্যকে সাধন করেছি। লক্ষ্য স্থির রেখে যদি আত্মবিশ্বাসের সাথে এগিয়ে যাওয়া যায় তাহলে যে কোন লক্ষ্যকে অর্জন করা সম্ভব। ঠিক তেমনি বছর পাঁচেক টেনে টুনে কষ্ট করে একটি ডিগ্রী অর্জন করে এখন একজন সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে প্যাটেন্ট এন্ড ট্রেডমার্ক অফিসে প্যাটেন্ট এক্সামিনার হিসেবে গত পাঁচটি বছর অতিক্রম করেছি। আলহামদুলিল্লাহ এখন আগের দশ বছরের অতীতের কষ্ট গুলো যখন চোখের সামনে ভাসে তখন ওগুলোকে স্বরণ করে নিজেকে স্বান্তনা দিই এই ভেবে যে কষ্ট করলে একদিন কেষ্ট মিলবে। সবচেয়ে যে জিনিসটি বেশি আমাকে আবেগপ্রবণ করে তোলে সেটি হচ্ছে এই প্রবাসে আমি এক কন্যা সন্তানের বাবা হয়েছি। এগুলো হচ্ছে প্রবাসে পাওয়া আমার এক একটা অধ্যায়।
কি হারালাম?
হারিয়েছি অনেক কিছুই, হারিয়েছি মায়ের মমতা এবং ভালোবাসা, হারিয়েছি বোনগুলোর আদর, হারিয়েছি ভাইয়াদের শাসন, হারিয়েছি বন্ধু বান্ধবের মিলনমেলা, হারিয়েছি গ্রামের মানুষগুলোর বুকে টেনে নেওয়া, হারিয়েছি প্রতিবেশীরদের অফার করা এক কাপ গরম চা, হারিয়েছি বিকেলের সোনারোদে প্রমোদের মাত্রা, হারিয়েছি বৃষ্টি দিনে ফুটবল খেলার সময়গুলো, হারিয়েছি স্কুলের স্যারদের মমতা, হারিয়েছি বাজারের আড্ডা, হারিয়েছি কুয়াশা ভোরে শীতের সকালে খেজুরের রস খাওয়া, হারিয়েছি সোনালী শৈশবের প্রতিটি স্বপ্নের হঠাৎ করে মৃত্যু হওয়া, হারিয়েছি অনেক আত্মীয় স্বজন যাদেরকে শেষ বারের মত এক মুঠো মাটি কবরে দিয়ে বিদায় দিতে পারিনি, এইভাবে অসংখ্য হারিয়ে যাওয়া গল্প চোখের সামনে ভাসছে।
তুলনামূলক ভাবে কোথায় ভালো আছি?
সত্যি বলতে আমাদের দেশের বর্তমানে যে অবস্থা ঐটার কথা চিন্তা করলে আমি মনে করি এই প্রবাসে অনেক অনেক ভালো আছি। আমার দেশে বাক্স্বাধীনতার বড়ই অভাব, অথচ এই প্রবাসে সরকারি চাকরি করে সরকারকে নিয়ে দুনিয়ার মন্ত্যব্য করলে ও কোন ঝামেলা পোহাতে হয় না। তাই তুলনামূলক ভাবে যদি বলি আলহামদুলিল্লাহ বেশ ভালো আছি।
শেষ কোথায়?

জানি না এই প্রবাস জীবনের শেষ কোথায়? হয়তো কোন একদিন “শরীফ মাহমুদ” ভাইয়ের মত আমার দেহখানি ও বাক্সবন্দী হয়ে দেশে যাবে একদিন, এবং সেদিনই হতে পারে আমার প্রবাস জীবনের শেষ অধ্যায়। মানুষ  কান্না কাটি করে বিদায় দিয়ে কয়েক দিন মনে রাখবে, এরপর ধীরে ধীরে আমার অস্তিত্ব, আমার গল্প, আমার জীবন বিলীন হতে থাকবে। হুম এই তো জীবন। একদিন মামুনকে সবাই ভুলে যাবে, এই ভুলে যাওয়াটাই স্বাভাবিক এবং নতুন মানুষ এসে এই ভূমিতে বিচরণ করবে। এভাবে একদিন প্রবাস জীবনের ইতি টানবো।

Image source: https://www.worldatlas.com/articles/in-which-layer-of-the-atmosphere-do-airplanes-fly.html

Leave a Reply