বর্ণহীন ভালোবাসা

প্রত্যেকটা মানুষই নানার বাড়ি কিংবা খালার বাড়ির গল্পের সাথে অধিকাংশ ক্ষেত্রে পরিচিত। তেমনি ছেলেবেলার গল্পের সাথে নানার বাড়ি কিংবা খালার বাড়িতে বেড়ানোর গল্পগুলোর সাথে আমি ও ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। নানার বাড়িতে কিংবা খালার বাড়ির ভালোবাসাগুলো ও যে কতটা মধুর হয় তা বলার অপেক্ষা রাখে না। আমার আম্মারা চার বোন, সবার বড় হচ্ছে আম্মা, তারপর বাকি খালাম্মারা। জগতের বোনদের প্রতি বোনদের ভালোবাসা যে কি রকম হয় তা হয়তো আম্মাদের বোন মানে আমার খালাদেরকে না দেখলে বুঝতামই না।

আমার আম্মার নাম আনোয়ারা বেগম। আদর করে সবাই আম্মাকে “আনু” ডাকতো। মরহুম নানার সেই ডাক এখনো আমার কানে বাজে, “আনুরে একটু এদিকে আয় তো”, ওদিকে আমার খালাম্মারা আদর করে ডাকে “আনু আপা”, মাঝে মাঝে যখন একা একা খালাম্মাদের বাড়িতে বেড়াতে যেতাম, তখন অস্থির হয়ে যেত। আমার বুবুটাকে নিয়ে আসিস নাই কেন? আনু আপু কেমন আছে? উনার শরীর কেমন এখন? আহারে কতদিন বড় আপুটাকে দেখি না। বিশ্বাস করবেন এই কথাগুলো শুনলেই বুকের ভিতরটা কেমন জানি খা খা করতো। এক ধরণের বর্ণহীন ভালোবাসা জন্ম নিত। মনে হত আম্মাকে না নিয়েই আমি যত ভুল করে ফেলেছি। প্রায় ১৫ থেকে ২০ মিনিট পর্যন্ত আম্মার গল্পই থাকতো। পৃথিবীর সব সুখ মনে হত তখন আমার হাতের মুঠোয়। নিজের মায়ের কথা খালাম্মারা জিজ্ঞেস করছে, কি যে ভাল্লাগছে।

তখন মনে হত আম্মা বড় বোন হয়ে ছোট বোনদেরকে কত না মায়া মমতায় রাখতেন। তা না হলে এই বোনদের ভালোবাসা এতটা ব্যাপ্তি ছড়াতো না। মজার জিনিস কি জানেন একটা মেয়ে তার জন্মস্থানে কতটা পরিচিত তা নানার বাড়িতে না গেলে বুঝতামই না। আমার মা তখনকার আমলে ক্লাস ফাইভ পাস করা একজন মেয়ে। আমার মাকে নিয়ে আমি সবসময় গর্ব করি। মাঝে মাঝে বলি ক্লাস ফাইভ পাস করে যে পরিমান বুঝার ক্ষমতা সৃষ্টিকর্তা আম্মাকে দিয়েছে, তা আজকের যুগে অনেক শিক্ষিত মানুষের কাছে পাওয়াটা আকাশ কুসুম বৈকি। আমি নানার বাড়ি গিয়ে নানাদের বাজারে গেলাম। আমার মরহুম বড় মামার নাম হচ্ছে খোকা। মামার সাথেই গিয়েছিলাম বাজারে। হঠাৎ মামা অন্যদিকে যাওয়াতে আমি একা একা বসে আছি একটা চা দোকানে।

কিছুক্ষন বাদে কিছু লোক আসছে দোকানে নাস্তা করার জন্য। হঠাৎ আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করলো, উনাকে এই গ্রামে নতুন দেখছি। আপনার পরিচয়, ঠিক তখনি বড় মামা এসে ঢুকলো। মামা বললো ও আমার ভাগ্নে। ওরা তো মনে হচ্ছে আকাশ থেকে পড়লো, কি বলেন? মামা বললো ওর বাড়ি সিলোনিয়া। এবারে হুট করে সবাই সমস্বরে বলে উঠলো ও কি আনু আপার ছেলে? এবার তো আমি নিজেই হতবাক। আমার আম্মাকে এরা সবাই চিনে অথচ আমাকে চিনে না। সাথে সাথেই পরটা গোশত অর্ডার দিয়ে বললো, ভাগিনা একটা কথা আছে জানো নাকি, নানার দেশের মাটি ও মামা। আমরা সবাই এখন তোমার মামা। মনে হচ্ছিলো মুহূর্তেই উনারা আমার জনম জনমের পরিচিত মানুষ। সত্যি মানুষকে ভালোবাসা দিতে জানলে সেটা যে কতটা ভেদ করতে পারে তা আমি নিজেকে দিয়েই স্বাক্ষী হয়েই রইলাম।

হুম ভালোবাসার কোন রং নেই, এই ভালোবাসাগুলোই বর্ণহীন। খালাদের ভালোবাসা বলেন আর সমাজের মানুষদের ভালোবাসা বলেন সবার মাঝে যেমন ছিল আন্তরিকতা তেমনি আদর, মমতা এবং সম্মানের কোন অংশেই কমতি ছিল না। সবচেয়ে বড় জিনিস হচ্ছে নিজের মায়ের প্রশংসা কিংবা মায়ের ব্যাপারে কোন কৌতুহল বিষয় জানতে চাইলেই তাদের প্রতি এক ধরণের অগাধ ভালোবাসার জন্ম নেয়। জানি পৃথিবীতে কেউ বেঁচে থাকবোনা, একদিন আমার মা, আমি সবাইকে এই মৃত্যুর কাছে হেরে যেতে হবে। তবু ও আমি আমার মায়ের এই ছোট ছোট ভালোবাসাগুলো বুকে আগলিয়ে আগামী প্রজন্মের কাছে এই ভালোবাসা গুলো ওদের অন্তরে গেঁথে দিতে চাই। আমার মায়ের মত পৃথিবীর সকল মায়েদের গল্পগুলো বর্ণহীন ভালোবাসা হয়ে আজন্ম ভালোবাসায় স্থান পাক। পুরোনো দিনের “আনুরা” যুগ যুগ মানুষের অন্তরে ঠাঁই করে নিক আর সন্তানদের জন্য এই ধরণের আনুরা আলোর পথ দেখিয়ে যাক সেই প্রার্থনা। সৃষ্টিকর্তা এই সব আনুদের সব সময় ভালো রাখুক।

 

Leave a Reply