বাংলাদেশী আমেরিকান “রইস ভূঁইয়া” মহত্বের এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত

সারাজীবন পড়াশুনা করে জেনে এসেছি “ক্ষমাই মহত্বের লক্ষণ”, এবং আজ পর্যন্ত অনেক মানুষকে অনেক কারণে ক্ষমা করে দিতে দেখেছি, কিন্তু রইস ভূঁইয়ার ক্ষমার দৃষ্টান্ত ছিল আমেরিকানরা সহ সারাবিশ্বের কাছে প্রশংসার দাবিদার।

রইস ভূঁইয়া ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশে জন্মগ্রহণ করেন। তিনি সিলেট ক্যাডেট কলেজ থেকে পড়াশুনা করেন। এরপর তিনি বাংলাদেশ বিমান বাহিনীর একজন কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত ছিলেন। উনি পরবর্তীতে কম্পিউটার প্রযুক্তি বিষয়ে অধ্যয়ন করতে নিউ ইয়র্ক সিটিতে পাড়ি জমান। তথ্য গুলো সিয়াটল টাইমস এবং উইকিপেডিয়া থেকে সংগ্রহ করা হয়েছে।

নাইন ইলেভেন (৯/১১) সন্ত্রাসী হামলার ঘটনার ঠিক ১০ দিন পরে ভূঁইয়া ডালাসের একটা কনভেনিয়েন্ট স্টোরে ঢুকলে প্রতিশোধ হিসেবে একজন “হোয়াইট সুপ্রিমেচিস্ট” মার্ক এন্থনি স্ট্রোম্যান এর দ্বারা আক্রমণের শিকার হন এবং ওই মুহূর্তে স্ট্রোম্যান রইস ভূঁইয়া সহ আরো কয়েকজন মানুষকে গুলি করেন। আল্লাহর অশেষ রহমতে রইস ভূঁইয়া বেঁচে যান। যদি ও ওখানে স্ট্রোম্যানের গুলিতে বাকি দুইজন সাথে সাথে নিহত হয়েছেন।

রইস ভূঁইয়ার মুখের উপর গুলি ধরে স্ট্রোম্যান জিজ্ঞেস করছিল উনি কোথা থেকে এসেছেন? এই কথা বলার পর পরই স্ট্রোম্যান গুলি ছুঁড়তে থাকে। ভূঁইয়া মাকে ডাকতে ডাকতে চিৎকার করতে থাকে। এই মা তাকে বাঁচতে শিখিয়েছেন এবং শিখিয়েছেন কিভাবে ইসলাম ধর্মে মানুষকে ক্ষমা করে দিতে হয়। তিনি বলেন, ইসলামে বলা হয়েছে যে, মানবজাতির জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতিকে বাঁচানোর মতই। আমি তাকে ক্ষমা করে দিয়েছি, এই সমস্ত নীতি আমাকে আরও এগিয়ে যেতে উৎসাহিত করেছে।

ভূঁইয়া যার বয়স ৪৬, মোটামুটি সকল প্রকার ইনজুরি থেকে সেরে উঠেছেন এবং ডালাসের একটি টেকনোলজি প্রফেশনালের ম্যানেজার হিসেবে দায়িত্বরত আছেন। আপনারা জানলে অবাক হবেন, এই ভূঁইয়া প্রায় বছর খানেক সময় অতিক্রম করেছেন মার্ক স্ট্রোম্যান এর জীবন বাঁচানোর জন্য। অথচ এই স্ট্রোম্যান ভূঁইয়াকে গুলি করার পূর্বে আরো দুই জন মানুষকে হত্যা করেছিল।

স্ট্রোম্যান কে আদালত মৃত্যুদণ্ড দণ্ডিত করেছিল। ভূঁইয়া স্ট্রোম্যানকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, এবং ভূঁইয়া স্ট্রোম্যানকে বাঁচানোর জন্য টেক্সাস কোর্ট এবং সুপ্রিম কোর্টে পিটিশন করেছেন যাতে স্ট্রোম্যানকে মেরে ফেলা না হয়। যদি ও কোর্ট অবশেষে ভূঁইয়ার আদেশ বাতিল করে দিয়েছে। ভূঁইয়া বলেন একজন মানুষকে মৃত্যুদণ্ড দিয়ে মেরে ফেললেই জীবনের অনেক কিছুই সংশোধন হয়ে যায় না, বরং স্ট্রোম্যান যদি বেঁচে থাকে তাহলেই তার মাঝে অনুশোচনার মধ্য দিয়ে হয়তো একজন মানুষকে ভালো হয়ে জীবনকে সুন্দর পথে এগিয়ে নেয়ার একটা উপায় খুঁজে পাওয়া যেত।

ভূঁইয়া আরো বলেন, মৃত্যদণ্ড কোন কিছুর সমাধান দিতে পারে না। যে পরিমান ঘৃণা পুরো পৃথিবী জুড়ে ছড়িয়ে আছে সেটাকে ও নিবারণ করা যাবে না। ভূঁইয়া স্ট্রোম্যানকে ক্ষমা করে দিয়ে তার জীবন বাঁচিয়ে একটা বিশাল পরিবর্বর্তন নিয়ে আসতে চেয়েছেন। যেদিন স্ট্রোম্যানের মৃত্যুদণ্ড দেয়া হল সেদিন স্ট্রোম্যান ভূঁইয়ার সাথে ফোনে একটু কথা বলতে চেয়েছেন। ফোন ধরেই স্ট্রোম্যান বলেছিলেন “ভাই আমি তোমাকে অনেক ভালোবাসি”

ভূঁইয়া বললো, আমি বিশ্বাসই করতে পারিনি এই স্ট্রোম্যান ১০ বছর পূর্বের সেই মানুষটা, যে আমার মুখের উপর গুলি চালিয়েছিল।

এই ঘটনা থেকে রইস ভূঁইয়া একটা নন প্রফিট অর্গানাইজেশন চালু করেছেন। যার নাম দেয়া হয়েছে “ওয়ার্ল্ড উইথআউট হেইট”, এটির মূল শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে, মানুষকে ক্ষমা এবং করুনার মধ্যে দিয়ে ওয়ার্কশপ গুলো করানো। সহমর্মিতার দূত হয়ে যাওয়া, শুধু স্কুলে এবং অফিসে ট্রেনিং দেয়া নয়, বরং জেলখানায় ও এই ধরণের ট্রেনিং দিতে হবে।

ভূঁইয়া আরো বলেন, আমাদের সমাজে এই ঘৃণা রোগ নিরাময় করার প্রয়োজন, যেটি এখন প্রতিটি সমাজের বিষাক্ত মানসিকতায় রূপ নিয়েছে। উনি আরো বলেন, স্কুল কিংবা কলেজের শিক্ষায় কিভাবে ভদ্রতা, কেয়ারিং এবং একজন ভালো মানুষ হতে হবে সেটা দেখায় না, যদি না আপনার পিতামাতা ও শিক্ষকরা অতিরিক্ত কিছু মাইল হাঁটতে ইচ্ছুক না হয়।

জানিনা এই রকম রইস ভূঁইয়া প্রতি ঘরে ঘরে জন্মাবে কিনা? তবে উনি স্ট্রোম্যানকে ক্ষমা করে দিয়ে যে পরিমান মানুষের ভালোবাসা এবং সম্মান অর্জন করেছেন তা ও কম কিসের। এই রইস ভূঁইয়া কে ওয়াশিংটন হোয়াইট হাউস থেকে আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল। রইস ভূঁইয়ার নামে এখন বই বের হয়। তার মধ্যে একটি বই হচ্ছে “দ্য ট্রু আমেরিকান” লিখেছেন আনান্দ গিরিধারাদাস এবং নিউ ইয়র্ক টাইমস বুক রিভিউ নামকরণ করেছে “১০০ নোটেবল বুকস” অফ ২০১৪। উনার কাছ থেকে আমাদের অনেক কিছু শিখার আছে। রইস ভূঁইয়া সব সময় ভালো থাকুক এবং উনি উনার লক্ষ্যকে আটকে ধরে একদিন বিজয়ের পতাকা উড়াবেন সেই প্রত্যাশা।

Image Source: https://www.seattletimes.com/entertainment/books/after-being-shot-in-the-face-rais-bhuiyan-becomes-forgiveness-ambassador/

 

Leave a Reply