বাবা মায়ের আদুরে কন্যা ফাতিহা মনির জন্মদিনে মেয়েকে লিখা খোলা চিঠি!

প্রিয় ফাতিহা,
হতে পারতো কোন এক নবান্নের দেশে পৌষ মাসের পিঠার উৎসবে এবং নরম শীতের আমেজভরা দিনটিতে তোর জন্ম, কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের কনকনে শীতের মাঝেই তোর আগমন হয়েছিল আজ থেকে ঠিক তিন বছর আগে এই দিনে। স্রষ্টা আমাদেরকে জান্নাত থেকে এক শ্রেষ্ঠ উপহার হিসেবে তোকে দিয়েছেন। জানিস তুই যখন এই পৃথিবীতে আসিস, বাহিরে তাপমাত্রা কত ছিল আমার ঠিক সেটা জানা নেই, তবে প্রচন্ড তুষার পাত হচ্ছিলো। তোকে দেখলাম তুষারের মতই শুভ্র হয়ে আমার শরীরের সাথে মিশে আছিস। আমি এখনো তোকে কোলে নেয়ার সেই মুহূর্ত গুলো স্মৃতিচারণ করি।

জানিস তোর জন্মের সময় তোর দাদা দাদু ছিল আমেরিকায়। সেই অনেক পূর্বে দেখতাম গ্রামীণ সমাজে কারো জন্ম হলেই নানা রকমের কাঁথা সেলাই করে উপহার দিতো, তোর ক্ষেত্রে ও দাদু সেটা অপূর্ণ রাখেনি। পুরোনো যত কাপড় ছিল তা দিয়েই রাতভর সেলাই করে তোর জন্য কাঁথা বানিয়ে তোকে বাসার মধ্যে স্বাগতম জানিয়েছে। যদি ও তুই প্যাকেটের মধ্যে তখন সারাদিন থাকতি। ওদিকে তোর দাদা দোকান থেকে খেলনা আনতে গিয়ে দুনিয়ার সব কুকুরের খেলনা নিয়ে হাজির, আমরা সবাই যে হাসাহাসি করলাম। উনি বললো দেখতে তো সবই মনে হল বাচ্চাদের খেলনা, কি আর করা, আবেগময় ভালোবাসা দিয়ে নাতনির জন্য এতটুকু নিয়ে এসেছে, এটাই বা কম কিসের।

আর ওদিকে নানা নানুর তুই হচ্ছিস একমাত্র লক্ষী সোনামনি। নানা নানু স্বর্ণের চেইন নিয়ে হাজির অথচ তোর ওই বয়সে গয়না সম্পর্কে কোন ধারণা নেই, যদি ধারণা থাকতো তাহলে দেখা যেত ঐটা বিক্রি করে দুধ কিনে খাচ্ছিস। ঐদিকে মামা মামীর সাথে খাতিরটা হচ্ছে চিপসের, মামা মামী চিপস দিলেই ঘর থেকে বাহির হবার নাম গন্ধ নেই। রীতিমত কিছুটা বুঝবুদ্ধি হবার পর থেকেই তুই এখন চিপস খোরে পরিণত হয়েছিস। মামা কাজ করে বাসায় আসলেই দরজার খুলার শব্ধ পেলেই মা বাবাকে ভুলে মামার সাথে উপরের রুমে রওয়ানা দিয়ে দিতি চিপস খাওয়ার জন্য। যতক্ষণ পর্যন্ত না তোর মন ভরবে ততক্ষন পর্যন্ত রুমের দরজা বন্ধ করেই সব সাবাড় করে আমাদের কাছে ফিরে আসতি।

কার্টুন দেখে দেখে ইদানিং তুই একা একা অনেক রাইম বলা শিখেছিস, মাঝে মাঝে কি একটা লালালালা করে গান ও গাইস। শুনতে অবশ্য যে কিউট লাগে তা বলে বুঝানো যাবে না। বাহিরে যেতে দেখলেই তুই আমার পিছু ছাড়িস না, শুধু অপেক্ষায় থাকিস কবে আমি জুতার কথা বলবো, জুতার কথা বললেই এক দৌঁড়ে সোফায় গিয়ে যখন বসিস তখন মনে হয় এগুলোই আমাদের একেকটা ভালোবাসার উপাখ্যান। বাহির হলেই হাটতে হাটতে যখন গাড়ির সামনে থমকে গিয়ে বলিস কার, কার, তখন আমার বুঝতে বাকি থাকে না তুই যে একটু একটু করে বড় হয়ে যাচ্ছিস। হুম এই জন্যই হয়তোবা অনেকেই বলে বসন্ত ঋতু যখন গ্রীষ্ম পেরিয়ে হেমন্তের দুয়ারে পৌঁছায়, তখন মায়েরা আবারও হয়ে যায় শিশু, আর মেয়েরা মা। আমরা তো সেই পথেই হেঁটে চলেছিরে ফাতিহা মনি। দেখতে দেখতেই তিন বছর কিভাবে যে কেটে গেল টেরই পাই নি।

প্রত্যেকটি বাবা মায়ের কাছে তাদের সন্তান যে কি জিনিস আমি তা শুধু তোকে দিয়েই উপলব্ধি করি। আর তখন এটা ও উপলব্ধি করি তোর দাদা দাদুর কাছে তার সন্তানেরা কি পরিমান স্নেহের এবং ভালোবাসার। তোর মুখের দিকে তাকিয়ে আমি পৃথিবীর সমস্ত কষ্টের কথা ভুলে যাই। বাসায় প্রতি মুহূর্তে তোর বিচরণ আমার শরীরে বেঁচে থাকার অক্সিজেন হিসেবে কাজ করে। তোর মায়ের কথা বলে শেষ করা যাবে না। এই ১০৯৫ দিন, মানে তিন বছর তোর মা সারারাত সারাদিন তোকে আদর, যত্ন, মায়া, মমতা এবং পাহারা থেকে এক বিন্দু পরিমান ও নিজেকে সরতে দেয় নি। পৃথিবীতে সন্তানের জন্য অনেক মায়েরা হয় আদর্শ, আর সেই ক্ষেত্রে আমি বলতে পারি তোর মা ও তোর জন্য আদর্শ হয়ে থাকবে সেই প্রত্যাশা।

সন্তানের প্রতি অনেক মানুষের অনেক চাওয়া পাওয়া থাকে, কিন্তু এক্ষেত্রে আমি ও আবার তেমন ব্যতিক্রম নই। আমার চাওয়া তুই একজন সৎ, নীতিপরায়ণ, নেককার, এবং ঈমানদার মানুষ হয়ে সবার মাঝে বেঁচে থাকবি। আল্লাহ তোকে যে পরিমান জ্ঞান দিবে সেটা নিয়েই আগামীর পথে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যাবি। তুই যে যুগে এখন আছিস সে যুগে ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার হওয়ার চাইতে একজন ভালো মনের মানুষ হওয়া খুব কঠিন। আমি চাই তুই একজন ভালো মনের মানুষ হয়ে দুর্দিনে মানুষের পাশে গিয়ে দাঁড়াবি, মানুষকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিবি। মহান রাব্বুল আল আমিন আমাদের সকল ইচ্ছেগুলোকে কবুল করুন।

তোর জন্মদিন ফিরে ফিরে আসুক শত সহস্র বছর। তোর উপস্থিতিতে বাবা মায়ের মনে যে আনন্দের বন্যা বয়ে যায়, তা চলমান থাকুক শতাব্দীর পর শতাব্দী। তোর সুন্দর এবং দীর্ঘ জীবন কামনায়।

-তোর বাবা

Leave a Reply