বাবা

অনেক মানুষকে বলতে শুনেছি, সর্বপ্রথম মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রথমে ভালোবাসতে হবে, তারপর না হয় অন্যকে ভালোবাসা যাবে। যদি ও আমি এক্ষেত্রে নিজেকে দ্বিতীয় স্থানে রাখতে চাই। আজকের “আমি” যার উছিলায় এই পৃথিবীতে তারা হচ্ছেন আমার বাবা মা। এই দুইজন মানুষকে আমি নিজের চাইতে ও খুব বেশি ভালোবাসি।

বাবা অতি চটপট একজন লোক কিন্তু অনেক ভদ্রতা জানেন। আর এটি ও জানেন মানুষের সাথে কিভাবে আপন হয়ে চলতে হয়। যেদিন থেকে একটু বুঝ বুদ্ধি হয়েছে সেদিন থেকে বাবার চিন্তা ও চেতনা গুলো একটু একটু করে মনের কোণে গেথে রাখতে লাগলাম। সেই ছোটবেলা থেকে দেখতাম নিয়ম মাফিক চলাফেরা করতেন। ভোর সকালে ফজরের নামাজ পরে ঠিক চলে যেতেন চা এর দোকানে। একটু আড্ডা মেরেই ঘন্টা দুয়েক পরে ফিরে আসতেন বাড়িতে। উনার আবার শখ ছিল গরু পালন করা। আম্মা বলতেন যাদের একটা গাভি গরু আছে তাদের ঘরে নাকি একজন ডাক্তার ও আছেন। কারণ খাটি গরুর দুধ আজকাল মানুষ বিক্রি করে না, চারিদিকে ভেজালে ভরে গেছে। তাই আম্মার মুখ থেকে ওই ধরনের উক্তি। যেটা বলছিলাম আব্বা সকালে দোকান থেকে বাড়িতে আসার পর মাঠে চলে যেতেন গরুর জন্য ঘাস কাটতে। কাজের ছেলে থাকা শর্তে ও তার মাঠে যাওয়া কেউ আটকাতে পারে নি। একদিন বললাম কি দরকার এত কষ্ট করার? উত্তরে বললেন, নিজের হাতে কাজ করলে অনেক ভালো লাগে তার, এবং আমাদের মহানবী (সা:) ও নিজের হাতে নিজের কাজ করাকে অনেক পছন্দ করতেন।গরুর খাবার রেডি করে চলে যেতেন গোসল করতে। এর ফাঁকে কিন্তু বেলা গড়িয়ে ১ টা বেজে গেছে। আম্মার রান্না বান্না দুপুর ১.০০ টার মধ্যে শেষ করা লাগতো। আব্বা জোহরের নামাজ পড়ে কাউকে বিরক্ত না করে নিজের হাতে খাবার তুলে সব কিছু আবার ঢেকে রেখে শুতে যেতেন। ২ বা ৩ ঘন্টা ঘুমানোর পর উঠে আছরের নামাজ পড়তেন। নামাজ শেষে সাইকেল নিয়ে সিলোনিয়া বাজারের উদ্দেশে রওনা দিতেন। বাজার করে ঠিক ফিরে আসতেন মাগরিবের একটু আগে। মাগরিবের নামাজ পড়েই একটু বাংলা খবর আর নাটক দেখতেন ঘন্টা তিনেকের মত। এরই মাঝে এশার নামাজ পড়ে আসতেন। এইভাবে করেই দিন গড়িয়ে গেল অনেক বছর এবং কাটিয়ে দিলেন তার সোনালী দিনগুলি। হয়ত ওই দিনগুলি মনে পড়লে এখন শুধুই চোখের কোণে জল আসবে কিন্তু ফিরে আর যাওয়া যাবে না। আজকের বাবাদের সাথে উনাদের তুলনা করলে একটা জিনিস লক্ষ্য করা যাবে। আজকের এই যুগে অনেক বাবারা আধুনিক জীবন যাপন করেন কিন্তু উনারা যেটা করেছেন সেটা আজকের আধুনিকতায় একটু ও ছোঁয়া লাগবে না। বাবা কে অনেক বেশি ভালোবাসি। তাই তার প্রত্যেকটা কাজ কে অনেক বেশি সম্মানের সাথে দেখি সেটা যত ছোট বা বড় হোক না কেন।

সেই ছোটবেলা থেকে দেখতাম ফজরের নামাজ পড়ে সকাল সকাল দোকানে চলে যেত। দোকানদার ঘুম থেকে ও উঠলোনা, উনি নিজে গিয়ে দোকানদারকে ঘুম থেকে জাগিয়ে নিজের চা নিজে বানিয়ে নিতো। গ্রামের মানুষরা সবাই একে একে চা দোকানের দিকে রীতিমত প্রাত্যহিক গল্প আর নানা রকম আলোচনায় জমিয়ে রাখতো পল্লী জীবনের কাহিনী। সময় সেতো আর বসে নেই। দিন যায় রাত আসে এমনি করেই সময়ের পারাপার। যেই না দোকান থেকে ঘরে আসতো গল্প গুজব শেষ করে, আম্মা ও ঠিক রেডি হয়ে বসে আছে দুনিয়ার খোঁচা মারা কথা নিয়ে। শীতের সকাল, খোলার পিঠা খেজুরের রসে চুবিয়ে আমাদের সকালের নাস্তা পর্ব যেই মুহুর্তে শেষ সেই মুহুর্তে আব্বা দোকান থেকে এসে ঘরে হাজির। যেই না আব্বাকে আম্মা বললো নাস্তা করতে, আব্বা তখন বলে তার ক্ষিধা নেই। সেই সাথে শুরু হয়ে গেল আম্মার খোঁচা মারা কথা, কেন ক্ষিধা থাকবে? দোকানের খাবার ঘরের খাবারের চাইতে অনেক মজা তাই না। আড্ডাবাজি ছাড়া তো আবার চা খাওয়া যায় না। আমাদের সাথে গল্প করে চা খাইতে এখন আর ভালো লাগে না। তাই উনার শুধু আড্ডাওয়ালা মানুষ চাই। মাঝে মাঝে আম্মা বলে উঠে, কোন মানুষগুলা আব্বার কথা বসে বসে শুনে আমি যদি একটু দেখতে পারতাম? আম্মার কথা পাশ কাটিয়ে উঠার জন্য আব্বা তখন আম্মাকে বলে এক কাপ চা দিতে। তার শুধু চা পান করার ক্ষুধা। তাই কোন রকমে আম্মার বানানো চা খেয়ে অন্তত অপরাধীর বোঝাটা একটু কমাতে চায়। আব্বা সেই সাথে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এসে ডাক দেয় আমাকে। উনি বলে স্কুল এর সময় হয়ে গেছে, তাড়াতাড়ি রেডি হয়ে যেন স্কুলের দিকে রওয়ানা দিই।

আমাদের একটা গাভী গরু ছিল, রোজ ২ থেকে ৩ কেজি দুধ দিতো। গরু দেখা শুনা করার জন্য একজন রাখাল বালক ও ছিল, কিন্তু রাখাল আব্বাকে খুব পছন্দ করতো কারণ প্রতিদিন রাখালের সাথে মাঠে গিয়ে গরুরু জন্য ঘাস আব্বা নিজেই তুলে নিয়ে আসতো, এগুলো সব ধুয়ে গরুর ঘাবলা রেডি করে রাখত বেলা ১২টার মধ্যে, রাখাল বালকটা জমি থেকে গরু নিয়ে এসে শুধু ঘাবলার সাথে বেঁধে দেওয়াই ছিল মনে হয় তার কাজ। বাকি সব কাজ আব্বা নিজ হাতে সেরে ফেলতেন। তো নিয়ম মাফিক যোহরের নামাজ পড়ে বেলা ১ টায় তার দুপুরের খাবার রেডি। মজার ব্যাপার হলো উনি নিজ হাতে ভাত তরকারী নিয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ২-৩ ঘন্টার একটা ভাতঘুম দিতেন। তারপর সুন্দর করে বিকেলে সাইকেলে নিয়ে আমাদের সিলোনিয়া বাজারে হাজির। ওই সময় আমি হাই স্কুলে পড়ি। কথা প্রসঙ্গে বলে রাখি, সাইকেল কিন্তু তৎকালীন আমলে আমার নানার বাড়ি মানে তার শ্বশুর বাড়ি থেকে পাওয়া। আমি জানি না, আব্বা বলে পুরস্কার স্বরূপ নানার বাড়ি থেকে দেওয়া হয়েছিল। মাঝে মাঝে এখন ভাবি ঐটা পুরস্কার না যৌতুক ছিল আল্লাহই ভালো জানে, হাহাহা। যাই হোক নানা যেহেতু খুশি মনে দিছে তাই পুরস্কার হিসেবে ধরে নিলাম। যেটা বলছিলাম ঠিক স্কুলে পড়াকালীন বড় ভাইয়া আমার জন্য বলে দিলেন, হোসেনের রেস্টুরেন্টে প্রতিদিন ৫-১০ টাকার খাবার আমি যেন বাকীতে খাই, মাস শেষে ভাইয়া ওই টাকা পাঠিয়ে দিতেন। দুই একদিন আমার খাবারের পরিমান একটু বেশি হয়ে যাওয়ায় ২০-২৫ টাকা বিল চলে আসতো। আর আব্বা যখন বাজারে আসতো তখন মাঝে মাঝে আমি ভাবতাম উনি চেক করতো আমি কত টাকা খাইছি আর যখনি দেখতো বিল বেশি হইছে বাড়ি গিয়ে আমাকে বকাবকি করতো। আমি তো ভাবলাম আব্বা প্রতিদিন চেক করে, তো একদিন বিকেলে স্কুল ছুটি হওয়ার পর আমি বাড়ির দিকে না গিয়ে রেস্টুরেন্টের দিকে চেক করতে আসলাম আব্বা কি চেক করতে আসছে নাকি? আমি যেটা দেখলাম রীতিমত আমাকে অবাক করে দিয়ে উনি হয়ে গেলেন আমার চোখে ভিলেন।

দেখি আব্বা খুব আরাম আয়েশে বসে খাওয়া দাওয়া করছেন, আর আমি লুকিয়ে লুকিয়ে দেখতেছি পাশের অন্য এক টেবিলে বসে। যেই না উনি বিল দিতে আসলো, তখন বলে মামুন কোন জায়গায় বাকী লিখে গিয়েছে আজ, সেখানে যেন উনার খাবার টাকাটা তুলে রাখে। এবার বলুন কেমন লাগে? ঠিক পিছনে দাঁড়িয়ে আমি, সাথে সাথে ডাক দিলাম আব্বা ব্যাপার কি? আজ ও নিশ্চয়ই বাড়িতে গিয়ে আমার উপর বকাঝকা শুরু করে দিতেন। তো আমি জিজ্ঞাসা করলাম, আপনি আমার নামে কেন বাকি লিখলেন? উত্তরে বলে, উনার কাছে নাকি ৫০০ টাকা ভাংতি নেই। আমি বললাম আমার কাছে দেন আমি ভাংতি নিয়ে আসি, ওমা তখন আবার আব্বার সুর পাল্টে গেল। বলে তুই কি খাবি যা আজ রিক্সা করে বাড়ি চলে যা, আমি রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে দিবো নে। মনে হয় জীবনে এই প্রথম আব্বা আমাকে স্কুল থেকে বাড়িতে রিক্সা করে যাওয়ার জন্য বললো। কি আর করা আব্বার সাথে তো আর তর্ক করতে পারি না বাজারে এত মানুষের সামনে। যাই হোক চুপ চাপ চলে আসলাম, আর বাড়িতে এসে আম্মাকে এই কাহিনী যখন বললাম, আম্মাতো হাসতে হাসতে শেষ, আর তার ফাঁকে আম্মা ও নিল একটা সুযোগ। বাড়ি যখন আসলো, আম্মা বলে ছেলের নামে বাকী খেয়ে আসো, আর বাড়িতে এসে ওর উপর শাসন কর তাই না। সেই থেকে আব্বা আর কখনো আমাকে বকাঝকা করে না, কিন্তু মাঝে মাঝে যখন ভাবি এই মিষ্টি গল্পগুলো আজীবন আমাকে ক্ষত করে যাবে কিন্তু ফিরে যেতে পারবোনা আমি শত চাইলে ও। এখন আর আশে পাশে বাকীতে খাবার দোকান ও নেই আছে শুধু সেই পুরোনো স্মৃতিগুলো যা আঁকড়ে থাকি সারাক্ষণ।

ইরি ধানের মৌসুম, তাই কৃষকের যেমন এক মুহূর্ত বিরাম নেই তেমনি আমার বাবার ও নেই। তো কি জন্য উনার ঘুম হারাম হয়ে গেল? প্রথমত তার জমিতে পানির ব্যবস্থা করতে হবে, দ্বিতীয়ত জমিতে হাল চাষ করে মই দিয়ে পুরো জমি সমান্তরাল করতে হবে, সমান্তরাল করার জন্য মই এর উপর বসার জন্য আবার হালকা পাতলা একজনকে বাবার চাই। কি আর করা তীর বিঁধলো আমার দিকে। আব্বা এসে বলে তুই মই এর উপর বস। আর গরু দুইটা আমাকে নিয়ে পুরা জমি চক্কর দিবে এই বলে সে আমাকে মই এর উপর শুইয়ে দিল, আর আমার চেহারা তো মাশাল্লাহ সেই এক রকম হইছে। পুরো শরীর কাদায় কাদায় ভরে গেছে, শুধু আল্লাহ রক্ষা করছে গরুর গোবর আমার মাথায় পড়ে নাই। ঠিক কিছুক্ষণ পর ধানের বীজ গুলো জমিতে ছিটিয়ে আমাকে বলে একটু পাহারা দিস তো। আমি বললাম বহু কাজ করাইছেন আমারে দিয়ে আর শুনমু না। আব্বা বলে না শুনলে খাবেন কি? ওমা! আমি বললাম কথা না শুনার সাথে খাবার এর সম্পর্ক কোত্থেকে আসলো? আব্বা বলে যদি হাঁস মুরগি এসে এগুলো নষ্ট করে তখন আর ভাত খেতে হবে না। ওহ আচ্ছা এই ব্যাপার। ঠিক আছে পাহারা দিব বলে বাড়ি ফিরে আসি।

সেই সাথে আমি স্বরণ করছি, আব্বা সাথে নিয়ে কত কিছু যে শিখিয়েছে।যে জিনিসগুলো খুব বেশি মনে পড়ছে সেগুলো হচ্ছে, আব্বার সাথে গিয়ে ভিটে বাড়ির উপর আলু লাগানো, ধনিয়া পাতা, লাল শাক, কাঁচা মরিচ, পাতাকপি, ফুলকপি, মূলা, সরষে, মসুরের ডাল, আর ও কত কি। ধানক্ষেতে গিয়ে কত যে ধান কেটেছি, মাঝে মাঝে আব্বাকে সাহায্য করার জন্য মাথায় করে ধানের ঘোছা নিয়ে এসেছি উঠান পর্যন্ত। তাল গাছের পাতা কেটে নিয়ে আসতাম সেই যে নদীর কূল থেকে, তখন জীবনের মাঝে যেমন ছিল অনেক গল্প ঠিক তেমনি ছিল মায়া মমতা। সুখ দুঃখে হাতে হাত রাখার অন্যরকম ছন্দ। জানি এখন আর সেই প্রাকৃতিক চাওয়া ও নেই আছে শুধু কৃত্রিম চাওয়া। এই ভালো লাগে আবার এই খারাপ, জীবনের পালাবদল এখন আর আগের মত রংধনুর রঙ্গে সাঝে না। সন্ধ্যে হলেই বাবার কোন চাপ আসে না পড়ালেখার জন্য টেবিলে গিয়ে বসতে। হারিকেনের আলো ও জ্বলে না তেমন যখন সন্ধ্যে হলেই এই ঘর থেকে ওই ঘর দিয়াশলাই এর খোঁজে উনি ছুটাছুটি করতো। হাঁস মুরগির খোয়াড় নেই যে ওদের ও সন্ধ্যে হলেই নিজ ঘরে ঢুকে ঘুমিয়ে পড়তে হতো। নেই আগেকার সেই পরিবারের সাথে এক হয়ে নাটক দেখার সময়। যুগের সাথে মানুষ যেমন হয়ে উঠছে আধুনিক, ঠিক তেমনি এই সব পুরনো স্মৃতি গুলো ও গুমরে গুমরে কাঁদে অবচেতন মনে একলা কোন লোকালয়ে। আর আমি বসে বসে ভাবি কবে আবার বাবার সাথে দা কোদাল নিয়ে জমিতে সব্জি চাষ করবো। আবার কবে দেখা হবে বাবার সাথে ওই জমিতে যেখানে উনি প্রকৃতির মাঝে কিভাবে বাঁচতে হয় কত নিপুন করে শিখিয়েছিলেন? জানি না কবে যাবো, তবে এতটুকু বলতে পারি তুমি যে শিক্ষায় শিক্ষিত করেছ তার চেয়ে বড় শিক্ষা আমি এখনো কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে গিয়ে ও শিখতে পারি নি। তোমার শিখানোর স্টাইল যে অন্যদের থেকে অনেক অসাধারণ। তোমার রাগ, তোমার আদর আর তোমার মমতা আমাকে তোমার কাছ থেকে শিখতে বাধ্য করেছে। তাই তো বলি মাঝে মাঝে তুমি আসলে সাধারণ নও, তুমি আমার চোখে একজন অসাধারণ মানুষ। আপনাদের প্রত্যেকের বাবা ভালো থাকুক, আর যত বেশি পারবেন উনাদের যত্ন করবেন। উনি হলো পৃথিবীতে পাওয়া এক অমুল্য সম্পদ যা মানুষ মিলিয়ন মিলিয়ন ডলার দিয়ে ও কিনতে পারে না। আপনারা সন্তানরা দয়া করে বাবা মায়ের প্রতি খেয়াল রাখুন এবং বেশি বেশি খেদমত করুন।

Leave a Reply