মাটির টানে প্রাণ ছুটতে চায় কিন্তু চাইলে কি আর ছুটে যাওয়া যায়

যে শহরে গাড়ির শব্দ ছাড়া একটা দিন অতিবাহিত করা ছিল দুঃসাধ্য ব্যাপার, যে মফস্বলে প্রতি ভোরে কৃষকের মাঠে যাওয়া দেখা ছিল নিত্যদিনের কাহিনী, যে চায়ের দোকানে সকাল হলেই গরম চায়ের নেশায় পল্লী গল্পে গল্পে ডুবে থাকতো প্রতিটি পাড়া, যে গ্রামের সোনালী ভোরের রোদ্দূরে মিশে থাকতো পূর্ব দিকের উদিত হওয়া সূর্যের মিষ্টি পরশ, যে গ্রামে মাটির চুলোর চারপাশে আগুন পোহাতে পোহাতে থাকতো মায়ের মিষ্টি আদর এবং ভালোবাসা, যে শহর থেকে গ্রামের স্মৃতি মনে পড়লেই এক মুহূর্ত অপেক্ষা না করে মাটির টানে ছুটে যাওয়া ছিল অহরহ ঘটনা, যে গ্রামের মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হত আমার এই অবুঝ মন, আমি সেই মাটির কথাই বলছি।

আমাকে প্রতি মুহূর্তে ওই মাটি খুব টানে, কিন্তু চাইলেই মুহূর্তে ওই মাটির কাছে যাওয়া সম্ভব নয়। দায়িত্বের খাতায় জীবন এখন ভিনদেশের কারাগারে বন্ধি। কেন জানি মনে হয় বাংলা মাকে আমি ইচ্ছে করেই বিসর্জন দিয়ে এই বন্ধি জীবন কিনে নিলাম? এই ভিনদেশে ও গাড়ি চলে কিন্তু দেশের মত আওয়াজ আসে না, এই ভিনদেশে ও চায়ের দোকানে গল্প হয় কিন্তু এখানে স্বাধীন পল্লীজীবনের গল্প হয় না, এই ভিনদেশে ও গ্যাসের চুলা আছে, কিন্তু মাটির চুলোর মত কোন ভালোবাসা কিংবা আদর খুঁজে পাই না, এবং সবচেয়ে যে জিনিসটি বেশি কষ্ট দেয় সেটি হচ্ছে এই ভিনদেশ থেকে দেশের মাটি আমাকে প্রচন্ড টানলে ও আমি ইচ্ছে করলেই পাড়ি জমাতে পারি না।

আমরা এই ভিনদেশকেই এখন নিজের ঘর হিসেবে মূল্যায়ন করা শুরু করেছি। এই প্রবাসেই নিত্যদিন আমার জীবন ওতপ্রোত ভাবে জড়িত। ইচ্ছে করলেই কিংবা হঠাৎ জন্মভূমিকে স্বপ্ন দেখলে ও এখানে সেই স্বপ্নের সাথে সাথেই মৃত্যু হয়ে যায়, হয়ে যেতে হয়। এখানে স্বপ্ন দেখা খুব সহজ, স্বপ্নে স্বপ্নে গ্রামের কিংবা শহরের অলি গলিতে ঘুরে বেড়ানো যতটা সহজ ঠিক ততটাই কঠিন বাস্তবতা।

আমাদের দেশের টানে ছুটে যেতে ইচ্ছে করলে ও অনেক প্রতিবন্ধকতা মুহূর্তেই সামনে এসে হাজির হয়ে যায়। যেমন আমি ব্যক্তিগতভাবে যদি বলি আমার খুব ইচ্ছে করছে দেশটা ঘুরে আসতে, কিন্তু ইচ্ছে করলেই এখানে হঠাৎ করেই সব কিছু করে ফেলা সম্ভব নয়। দেশে যাওয়ার পূর্বে আমাকে আমার চাকরির অবস্থান ঠিক করে সিদ্ধান্ত নিতে হবে, চাকরি ঠিক থাকলে এরপর আছে বিলিং। দেশে যাবার আগেই মিনিমাম আমাকে তিন থেকে চার হাজার ডলার ব্যাংকে ডিপোজিট রেখে যেতে হবে, কেননা প্রতি মাসেই আপনার গ্যাস, ইলেক্ট্রিসিটি, পানি, ইন্টারনেট, ফোন, বাড়ির মর্টগেজ, ক্রেডিট কার্ড বিল এবং দেশ থেকে ফিরে এসে বাজার কিংবা হাত খরচের জন্য কিছু ডলার জমা রেখে যেতে হয়। এটা তো শুধু সিম্পলি আমি আমার কথা বললাম, খোঁজ নিলে দেখবেন অনেকের আরো বড় লম্বা লিস্ট। তাই অনেক কিছু ঠিক করে প্ল্যানগুলো সফল করে নিতে হয়।

তারপর আমাকে দেশে যেতে হলে মিনিমাম কয়েকদিনের জন্য হলে ও চার থেকে পাঁচ হাজার ডলার সাথে করে নিয়ে যেতে হবে। পাশাপাশি দেশে যাচ্ছেন, দেশের মানুষদের জন্য কিছু না নিয়ে গেলে আপনি যে বিদেশ থেকে গেছেন সেটার প্রতিফলনই ঘটবে না। তো যখন এই সমস্তকিছু ঠিক হবে তখন আমি বা আপনারা এই ইচ্ছের প্রতিফলন ঘটাতে চেষ্টা করতে পারি। কিন্তু প্রবাসে যারা থাকেন তাদের ক্ষেত্রে এই জন্যই সবুজ শ্যামল দেশে মাটির সোঁদা গন্ধ আপনাকে বা আমাকে টানলে ও এই সমস্ত কর্মকান্ডের জন্য সেটা আর বাস্তবতায় আলোর দেখা পায় না, এবং সাথে সাথেই ওই ইচ্ছের কিংবা স্বপ্নের দাফন করে ফেলতে হয়।

এইজন্য ভিনদেশে অধিকাংশ মানুষের সুখের গল্পের চাইতে দুঃখের গল্পই অনেক বেশি হয়ে যায়।মানুষ জীবনকে এই সমস্ত ধকলের মধ্যে দিয়ে যেতে যেতে একসময় নিজেদের মানিয়ে নিতে শিখে। এই জন্যই অনেকে এই স্বদেশের মাটিকেই ভুলতে বসে। মানুষ যখন আগুন নিয়ে খেলতে খেলতে কষ্ট সহ্য করা শিখে যায় তখন আর তার ভিতরে দেশের প্রতি যে মমত্ববোধ, মায়া, দেশপ্রেম, এবং ভালোবাসা কোন কিছুই কাজ করে না। ওরা ভাবে যান্ত্রিক জীবনই বর্তমান সুখের চাবিকাঠি।

আসলে কি তাই? নাহ সত্যি বলতে দেশের নির্মল বাতাসে যদি এক মিনিট ও নিঃশ্বাস নেয়া যায়, সেখানেই মানুষ নিজেদের হারিয়ে ফেলতে ও দ্বিধাবোধ করে না। এই জন্যই বোধহয় সব প্রবাসীরাই স্বপ্ন দেখে যদি শেষ নিঃশ্বাসটা ও দেশের মাটিতে নেয়া যায় তাহলে মরে গিয়ে ও প্রশান্তি লাভ করা যায়, এবং এটাই হচ্ছে মাটির টান। যে মাটি আমাকে প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে তার দিকে ধাবিত করে। ভিনদেশে যতই বাস্তবতার মুখোমুখি হই না কেন, সবচেয়ে বড় বাস্তবতা হচ্ছে যেদিন আমি বাংলাদেশের মাটিতে পা রেখে মাটি ও মানুষের গন্ধ নিতে পারবো সেদিনই আমি আলিঙ্গন করে বলবো, এই মাটি আমার জন্মভূমি, এই মাটি আমার আরেক মা। ভালোবাসি বাংলা মা তোকে। এইজন্যই বাংলা মায়ের বুকে অনেক অনিয়ম, অন্যায় এবং অবিচার ঘটলে ও এক বিন্দু ভালোবাসা ও এই মাটির জন্য কখনই কমে নি এবং কমবে ও না ইনশাআল্লাহ। পথ চলতে চলতে একদিন এই মাটিকে জড়িয়ে সব ভালোবাসা নির্গত করে দিবো সেই প্রত্যাশায় এখনো আশায় বুক বেঁধে রাখি।

ছবি: তিন থেকে চার বছর আগে তোলা আমাদের বাড়ির ঘাটার সামনে। কত স্মৃতি এই রাস্তায় জমে আছে। আজকাল রাস্তা ও আমাদের অনেক মিস করে, আমরা দূরে বসে শুধু কল্পনায় প্রতিচ্ছবি দেখি।

Leave a Reply