মা: পার্ট ১, একটি সত্য ঘটনা অবলম্বনে

এমনিতে আমেরিকার লাইফে অনেক ব্যস্ততা। তারপরে মাঝরাতে বাংলাদেশ থেকে কোন ফোন কল আসলেই অনেক ভয় কাজ করত, কারণ অনেক আত্মীয় স্বজনের খারাপ খবর পেয়েছি যারা এই পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেছেন ওপারে অথচ শেষ বারের মত একবার রক্তের সম্পর্ক গুলোর মুখ তো দূরের কথা, এক মুঠো মাটি ও দিতে পারিনি। যাই হোক আসি মেয়েটির গল্পে, যে মেয়ে বাস্তবতার সাথে অনেক সংগ্রাম করে তিলে তিলে তার সংসারের দায়িত্ব পালনে সদা অটল থেকেছেন আজ সেই মেয়ের গল্প বলবো।

তখন রাত কত ১১ কিংবা ১২ টা বাজে। বাংলাদেশ থেকে হঠাৎ করে একটা ফোন কল আসলো। প্রথমে ভাবলাম ধরব না। কারণ অজানা একটা ফোন নম্বর থেকে প্রাইভেট কল দেখতেছি ফোনে, পরে কি মনে করে দ্বিতীয় বারের সময় ধরলাম। মৃদু কন্ঠে ভেসে আসলো একটি খবর, যে মেয়েটাকে সেই ছোটবেলা থেকে চিনি খবরটা তার। মেয়েটার নাকি কিডনিতে ক্যান্সার ধরা পড়েছে। এই মেয়েটার সাথে জীবন এতটাই ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে আছে যা শুনার পর আমি নিজেই হাউমাউ করে কান্না করে ফেলি। ঘুম তো পুরোটাই হারাম হয়ে গিয়েছে। কোনরকমে রাতটা শেষ করে কলেজে গিয়ে শিক্ষকদের কাছে অনুমতি চাইলাম যদি উনারা দয়া করে আমাকে সবগুলো ক্লাসে ইনকমপ্লিট দেয়। বিস্তারিত বর্ণনা করার পর সব শিক্ষক রাজি হলেন।

বিপদেই নাকি বন্ধুর আসল পরিচয়। নিজের কাছে অত পরিমান টাকা না থাকায় বন্ধুদের শরণাপন্ন হলাম। বন্ধুগুলো ও হয়ত আমাকে অনেক ভালবাসে বলে একবিন্ধু ও নিষ্ঠুরতা দেখায়নি। যে যেভাবে হেল্প করার আমাকে সাহায্য করেছে দেশে যাবার জন্য। আমি আজীবন কৃত্তজ্ঞ থাকব ওদের কাছে। ওদের ঋণ কখনই শোধ হবার মত নয়। যাই হোক এক ঘন্টার মধ্যে মতামত নিয়ে সব ঠিক করলাম। ইমার্জেন্সি টিকেট করে আমি এয়ারপোর্ট এর উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলাম। প্লেনে বসে একটা কল করলাম কি রকম অবস্থা জানার জন্য। ঠিক তখন উত্তর আসলো মেয়েটিকে ইনটেনসিভ কেয়ার ইউনিট এ নেয়া হচ্ছে। ফোন টা আর ধরে রাখতে পারিনি। চোখের কোনে অশ্রু গড়াগড়ি করছে ততক্ষণে। পাশে বসা ভদ্র লোকটি আমাকে টিস্যু দিলেন অশ্রুসিক্ত জল মুছার জন্য। মনকে বুঝাতে না পেরে আবার একটা কল দিলাম। মেয়েটি অপারেশনে যাওয়ার আগে নাকি আমার সাথে একটু কথা বলবে। আমার ক্রন্দন কোনভাবেই থামাতে পারছিনা, আর ওই সময় মেয়েটি আমাকে বলে, একদম চিন্তা করিস না। সব ঠিক হয়ে যাবে, বাঁচা মরা যেহেতু উপরওয়ালার হাতে কিছুই তো বলা যায় না। অমন সময় মেয়েটি আমাকে বলে “তুই আমাকে মাফ করে দিস”। বিশ্বাস করবেন, আমার লাইফে আমি কোনদিন এত কাঁদি নি, যখন এই মেয়েটির কোন অন্যায় না থাকা শর্তে ও সে আমার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছে। আমি। আর কোন কথা না বলেই ফোনটা রেখে কাঁদতে থাকি, কাঁদতে কাঁদতে শুধু এইটুকুই বলি কিভাবে মেয়েরা এইরকম হয়।জানেন বুকটা এতটাই ফেটে যাচ্ছিলো তখন মেয়েটার কথাটা শুনে, শুধু মহান আল্লাহর কাছে দোয়া করেছিলাম যেন রাব্বুল আল আমিন আমাকে দেশে পৌঁছে একটু কথা বলার সুযোগ দেয়। ১৮ ঘন্টা জার্নি তখন আমার কাছে মনে হয়েছিল ১৮ বছর।

যখন ঢাকা এয়ারপোর্ট গিয়ে নামলাম কোনো রকমে একটা সিম কার্ড নিয়ে কল দিলাম। জিজ্ঞাসা করলাম মেয়েটি কেমন আছে। উত্তরে বল. তার অপারেশন অনেকটা সফল কিন্তু এখনো তার অনেক গুলো চেক আপ বাকি। মনের মাঝে একটু প্রশান্তি পেলাম, কিন্তু কি যে ছটফট করেছিলাম শুধু একবার মুখখানা দেখার জন্য? এয়ারপোর্ট থেকে সরাসরি হাসপাতাল। থার্ড ফ্লোর্রে মেয়েটিকে রাখা হয়েছে। মেয়েটির অনেক চেনা জানা মুখ তার সামনে শধু আমি নেই।

কিছুক্ষনের মধ্যেই হসপিটালে এসে পৌঁছালাম। যেই মাত্র দরজাটা ওপেন করলাম দেখি মেয়েটা অশ্রুসিক্ত নয়নে তাকিয়ে আছে, কিন্তু মুখে কোন কথা নেই তার। আর দু নয়নে জল ভাসিয়ে তার দু হাত বাড়িয়ে দিয়েছে আমার দিকে। মনে হচ্ছিলো দুনিয়ার সমস্ত বাঁধাকে পিছনে ঠেলে এক দৌঁড়ে মেয়েটিকে বুকে বিশ মিনিটের মত জড়িয়ে ধরলাম। কি পরিমান কেঁদেছি তা হয়ত বলে বুঝাতে পারবো না। কারণ এই গল্পের মেয়েটি ছিল আমার প্রিয়, একমাত্র চোখের মনি, জন্মদাত্রী হতভাগিনী “মা”, আমাকে দেখার পর পরই মনে হলো মুহূর্তেই অর্ধেক সুস্থ হয়ে গেল, কিন্তু দিন রাত যেভাবে পেরেছি একটু ভালবাসার চেস্টা করেছি। মা তো আজীবন ই ভালোবাসলেন, ভালোবাসবেন। প্রতিদিন দূর থেকে তো আর ভালোবাসা যায় না। আজ না হয় একটু বুকের মাঝে আটকিয়ে মনের মাধুরী মিশিয়ে তাকে ভালোবাসবো।

সেই যে মা ক্যান্সার এ আক্রান্ত হলেন এখনো সেই থেকে অজস্র অসুখ আর যন্ত্রণা ভুগেই চলতেছেন। তার কষ্টের ভার আমি যে আর সইতে পারি না। মাঝে মাঝে রাতে প্রায় মা ঘুমাতে পারে না। কি যে অশান্তি তার আমি যদি নিজের চোখে না দেখতাম তাহলে কখনই বুঝতাম না। মহান আল্লাহর কাছে সারাজীবন পৃথিবীর এই “মা” দের জন্য দোয়া করি যেন উনারা ভালো থাকেন সারাজীবন কোন কষ্ট ছাড়াই। আল্লাহ যেন আমার মা টাকে সুস্থ করে দেন সেই দোয়া করি।

Leave a Reply