দশ মাসের মেয়েকে লিখা বাবার চিঠি

আমার একমাত্র দশ মাসের মেয়ে “ফাতিহা” মণিকে লিখা এই চিঠি। ওকে নিউ ইয়র্ক রেখে এসেছি কয়েক দিন হল, কি পরিমান মিস করতেছি তোকে তা বলে বুঝাতে পারবোনা? জানি তুই কিছুই বুঝবি না, আমি চাই ও না তোকে এখনই কিছু বুঝতে হবে। তবে যখন বুঝ বুদ্ধি হবে তখন বাবার লিখা এই চিঠি সময় করে পড়ে নিস।

স্নেহের কলিজার টুকরা ফাতিহা,
তোর জন্য রইলো অফুরন্ত আদর এবং ভালোবাসা। তুই এখন কি করতেছিস আমি সব কল্পনায় বসে বসে এঁকেছি? কার্টুন দেখিস তাই না, নাকি বিছানায় কালো কোন ময়লা জিনিসকে মুখে দেওয়ার জন্য খুঁজে বেড়াচ্ছিস, হতে পারে রকিং চেয়ারে বসে খাবার খাচ্ছিস, তা না হলে মায়ের সাথে দুষ্টমি করিস জানি তো। শুন তোকে নিয়ে বাবার অনেক স্বপ্ন। অনেক স্বপ্নের মাঝে একটি বিশাল স্বপ্ন তোকে নিয়ে বাংলাদেশ ঘুরতে যাওয়া।

জানিস মা, এই বিদেশে সবই আছে কিন্তু বাংলাদেশের যে গ্রামীণ আবহ গুলো আমরা দেখেছি, যেগুলো দেখে আমরা বড় হয়েছি, সেগুলো এইখানে খুঁজে পাওয়া দুর্লভ। তুই তো এখনো তোর গ্রামের বাড়িতেই যাস নি। ঘুরতে যাবার আগে তোকে বলে রাখি কি নেই ওখানে? ওখানে চারপাশে আছে মায়া ভরা মানুষের দলাদলি, আছে পুকুর ভরা মাছ, আছে কোকিলের কুহুতান, আছে নির্মল বাতাস, আছে কাশফুলের বাগান, আছে অতিথি পাখি , জানিস আমাদের ঢাকা শহরকে “মসজিদের শহর” বলে সবাই চিনে, কি সুমধূর কণ্ঠে ভেসে আসে মুয়াজ্জিনের আযান, এই আমেরিকায় গত ১৪ বছর এই ধরণের কোন কিছুই এখনো খুঁজে পাই নি।

ওখানে দেখতে পাবি মৌসুমী আম জাম কাঁঠালের সমারোহ। জানিস মন চায় তোকে দর্শক বানিয়ে রেখে বৃষ্টিতে ফুটবল খেলতে, মন চায় আবার সেই দুরন্তপনার মত অনেক দূর থেকে দৌঁড়ে পুকুরে লম্প ঝাঁপ দিতে, হয়তো এর মাঝে আমার বাবা এসে আমাকে আবার বারণ করবে যাতে আর লাফ না দিই কারণ ঠান্ডায় যাতে শরীর খারাপ না হয়ে যায় সেই ভেবে। জানিস ছোটবেলায় আমার খুব প্রিয় নাস্তা ছিল চাউল ভাজা আর গরম চা, ইচ্ছে করে তোকে নিয়ে বসে আবার সেই জিনিসগুলো পুনরাবৃত্তি করি। জানিস মা, বাড়ির দরজায় ছিল কৃষ্ণফুলের গাছ, যখন আমরা ক্রিকেট খেলতাম তখন গাছে বল লাগলেই হুর হুর করে ফুল গুলো ঝরে পড়তো, মাটির দিকে তাকালেই মনে হত কেউ যেন এখানে রক্তিম আভা মেখে রেখেছে, আসলে জানিস ওগুলো কি? ওগুলো ছিল কৃষ্ণচূড়ার ফুল। জানিস গ্রাম্য আবহে সকালের নাস্তায় ছিল খেজুরের রসের সাথে খোলার পিঠার জমজমাট আয়োজন। অবশ্য তুই দেখবি কিনা জানি না? তখন ঢেঁকিতে করে এই চাউল কে গুঁড়া করত গ্রামীণ সমাজে বেড়ে উঠা মহিলারা যাদের মধ্যে আমার মা ও ছিল একজন, মানে তোর দাদু। শীতের দিনে তোকে পাশে বসিয়ে খড়কুটো দিয়ে আগুন পোহাতে পারলে হয়তো আমার আরেকটি অভিলাষ পূর্ণতা পেতো। ইচ্ছে করে শীতের শিশিরে তোর পা দুখানি ভিজিয়ে খাখা রোদ্দুরে আবার শুকিয়ে নিতাম। যদি কখনো তুই বাংলাদেশে থাকাকালীন আমাদের এলাকা বন্যায় প্লাবিত হয়ে যায় তাহলে ইচ্ছে আছে ভেলায় ভেসে ভেসে পুরো গ্রাম ঘুরে সবার খোঁজ খবর নিয়ে আসবো। তোর মায়ের শখ ছিল সরষে ক্ষেতে বসে সরিষা ফুলের গন্ধ আহরণ করতে কিন্তু জানিস এমন সময় আমরা দেশে গিয়েছিলাম যখন গরমে রাত ১২ টায় ও আমাকে পুকুরের মধ্যে অবস্থান করতে হল। তাই ওই সময়ে অতিরিক্ত গরমে তোর মায়ের সে স্বপ্ন পূরণ হয় নি, কিন্তু আমি তোকে নিয়ে সেই সরিষা ক্ষেতে বসে একটা ছবি তুলে ফ্রেমে বাধাই করে রাখতে চাই।

জানিসরে মা এই আমেরিকাতে বিগত ১৪ বছরে খোলা আকাশের নিচে বসে কখনোই জোছনা দেখা হয় নি আমার, কিভাবে হবে বল? এই জীবন যে এইখানে অনেক যান্ত্রিক। সবই আছে এখানে তারপর ও কি যেন নেই নেই? কিন্তু আমার ইচ্ছে করে তোকে নিয়ে বাড়ির উঠোনে পাঠি পাতার উপর শুয়ে জোছনা দেখার, আর তোকে বুকে নিয়ে খোলা আকাশের নিচে শুয়ে তারা গুনবার। আরো ইচ্ছে করে তোকে নিয়ে গ্রামের পাশে যে ছোট নদীটি অবস্থিত যেখানে একটি সাঁকো আছে ওটার উপর তোকে নিয়ে বসে খরস্রোতার পানিতে দু পা ভাসিয়ে দিয়ে স্রোতের তীব্রতায় নিজেকে হারিয়ে শুধু দেখতাম কিভাবে গাংচিলরা উড়ে উড়ে এপাড়া থেকে ওপাড়ায় শঙ্খচিলের মত ভেসে বেড়ায়, জানিস মা ওখানে মানুষ রিক্সায় করে কত জায়গায় ঘুরে বেড়ায়, আমি ও একদিন তোকে পাশে বসিয়ে আমাদের প্রিয় গ্রামখানি ঘুরে বেড়াবো আর তোকে প্রত্যেকটি জায়গার সাথে পরিচয় করিয়ে দিব যেখানে তোর বাবার শৈশব, কৈশোর ছিল এক স্বপ্নময় অধ্যায়।

জানিস তুই বাসায় নেই কিন্তু তোর গন্ধ সারা বাড়ি জুড়ে বিরাজ করছে। তোর খেলনা দেখলেই আমি থমকে দাঁড়িয়ে তাকিয়ে থাকি আর ভাবি এই বুঝি আমার লক্ষী মামণিটা ওগুলো নিয়ে খেলায় মেতে উঠেছে। মাঝে মাঝে তোর হাঁসির ভিডিও গুলো দেখে নিজেকে স্বান্তনা দিই। আজ হঠাৎ কেন জানি দুচোখের কোনায় অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিলো তোর কথা স্বরণ করায়। জানিস মা, পৃথিবীতে বাবা মা না হওয়া পর্যন্ত আসলেই কোন ছেলে বা মেয়ের এতটুকু ও হিতাহিত জ্ঞান থাকে না সন্তান যে কি জিনিস। তুই আমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে যেন বিচরণ করতেছিস। দিনে দিনে তোকে ছাড়া থাকাটা আমার কাছে অনেক দুর্বোধ্য মনে হয়। আমি চাই না তুই আমার কাছে থেকে এক মুহূর্তের জন্য ও দূরে থাকিস কিন্তু জগৎ কি আর সব নিয়ম কানুন মেনে চলে। তাই ক্ষণিক সময়টা তোকে এই যান্ত্রিক নগরীতে ইচ্ছের বিরুদ্ধে হলে ও ছেড়ে দিতে হয়। জানি তুই মাঝে মাঝে এখন দুই ঠোঁট উঁচু করে চেষ্টা করিস বাবাকে ডাকতে, যদি ও পুরো বাবা না ডাকতে পারলে ও যখন তুই বা বা বা করিস ঠিক তখনি আমি পৃথিবীর সমস্ত কিছু রুখে দিয়ে বুকের পাঁজরে তোকে আটকে ফেলি ভালোবাসার দু হাত দিয়ে, আমি বলতে থাকি তোকে হারাতে দিবো না কোথা ও। বাবা আসতেছি খুব শিগ্রই তোকে নিয়ে আসতে। তুই যেখানে থাকিস, যেভাবে থাকিস, সৃষ্টিকর্তা তোর হেফাজত করুন। আর আমার স্বপ্নকে একদিন আমি বাস্তবে রূপ দিবো সেই প্রত্যাশা আমি করতেই পারি। আজ এই পর্যন্তই। তোর জন্য অসংখ্য ভালোবাসা এবং আদর জমা রইলো। ভালো থাকিস সব সময় এবং নিজে মানুষ হবার পাশাপাশি মানুষকে ভালো পথে চলার উপদেশ দিবি এই প্রার্থনা।

ইতি
ফাতিহার বাবা

Leave a Reply